বঙ্গজুড়ে দফায় দফায় অতি ভারী বৃষ্টির তাণ্ডব! আগামী ২৪ ঘণ্টায় লাল সতর্কতা জারি করল আলিপুর আবহাওয়া অফিস

দফায় দফায় হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টির হাত ধরেই বর্তমানে গোটা বঙ্গজুড়ে এক নাগাড়ে শ্রাবণ ধারা ঝরে চলেছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একটি শক্তিশালী নিম্নচাপের প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এই আবহাওয়ার অবনতির কারণে উপকূলবর্তী জেলাগুলির পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে উপকূলবর্তী এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে মৎস্যজীবীদের সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।
আলিপুর আবহাওয়া অফিসের পূর্বাঞ্চলীয় অধিকর্তা হাবিবুর রহমান বিশ্বাস জানিয়েছেন যে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি অত্যন্ত ধীরগতিতে পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সোমবার বিকেলে এই গভীর নিম্নচাপটির কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের অত্যন্ত কাছাকাছি, দিঘা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে এবং হলদিয়া থেকে ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৭ কিলোমিটার বেগে এগিয়ে এসে দিঘা ও হলদিয়ার মধ্যবর্তী পশ্চিমবঙ্গ-ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করেছে। এর সরাসরি প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, হাওড়া এবং কলকাতায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, আগামী দু’দিন পর থেকে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমতে শুরু করবে।
চলমান এই লাগাতার ভারী বৃষ্টির নেপথ্যে রয়েছে এক ভৌগোলিক রহস্য। উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে আবহাওয়াবিদরা দেখতে পেয়েছেন যে, এর পেছনে কাজ করছে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সুবিশাল মেঘ ও বৃষ্টিপাতের বলয়। উত্তর ভারত, হিমালয় অঞ্চল, চিনের কিছু অংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল মেঘ বলয়ই পূর্ব ভারত ও কলকাতায় বৃষ্টির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ দিন পর্যন্ত রাজ্যে বৃষ্টির এই অনুকূল পরিস্থিতি পুরোপুরি বজায় থাকতে পারে। তবে আগামী ৩১ জুলাইয়ের পর থেকে এই দীর্ঘ মেঘ বলয়টি ধীরে ধীরে ভেঙে একাধিক ছোট নিম্নচাপ এলাকায় পরিণত হবে এবং পরবর্তীতে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে, যার ফলে বৃষ্টির পরিমাণ অনেকটাই হ্রাস পাবে।
এদিকে, বৃষ্টির এই স্বস্তির মাঝেই আবহাওয়াবিদরা নতুন করে এল নিনো (El Nino) সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর প্রভাব বাড়তে শুরু করায় চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে এর প্রভাব ভারতের মৌসুমী বায়ুর ওপর পড়তে পারে। সাধারণত এল নিনো সক্রিয় হলে মৌসুমী বায়ু কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনেক অঞ্চলেই পর্যাপ্ত বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যদিও এর প্রকৃত প্রভাব কতটা হবে, তা আগামী কয়েক সপ্তাহের সামগ্রিক আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে। তবে গত তিন দিনে দেশের বিভিন্ন অংশে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের অন্যতম সর্বোচ্চ বৃষ্টিস্নাত পর্ব।
অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের আবহাওয়ার চিত্রটি এই মুহূর্তে কিছুটা ভিন্ন। সেখানে গত কয়েক দিন ধরে বৃষ্টিপাত অনেকটাই কম ছিল, তবে বুধবার থেকে উত্তরবঙ্গের ওপরের দিকের পাঁচটি জেলায় পুনরায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আকাশ মূলত মেঘলা থাকবে এবং কয়েক পশলা হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পাশাপাশি কিছু কিছু এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, সোমবার কলকাতায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩০.০৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৬.০৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তি বজায় রয়েছে।