আধার স্রষ্টা নন্দন নিলেকানির হাতে বড় দায়িত্ব! পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্দিন ঘোচাতে কি মোদীর তুরুপের তাস তিনিই?

ভারতের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যবস্থায় লাগাতার প্রশ্নফাঁস এবং নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগে যখন গোটা দেশ তোলপাড়, ঠিক তখনই পরিস্থিতি সামাল দিতে এক যুগান্তকারী ও মাস্টারস্ট্রোক পদক্ষেপ গ্রহণ করল কেন্দ্র সরকার। নিট (NEET) পরীক্ষা কেলেঙ্কারির জেরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঠিক একদিন পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত, স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত করতে একটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক ফোর্স গঠনের ঐতিহাসিক ঘোষণা করেছেন। আর এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্যানেলের প্রধান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও ব্যবসার আইকন, ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘আধার’ (Aadhaar)-এর মূল রূপকার নন্দন নিলেকানিকে। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের চিরস্থায়ী সমাধান খুঁজতে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন এই মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা ডিজিটাল পরিকাঠামো গঠনে নন্দন নিলেকানির অবদান সর্বজনবিদিত। ২০০৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদায় তাঁকে ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (UIDAI)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বেই ভারতের কোটি কোটি মানুষের বায়োমেট্রিক পরিচয় সংগ্রহ করে বিশ্বের বৃহত্তম ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা ‘আধার’ সফলভাবে গড়ে ওঠে। এত বিশাল জনসংখ্যার ডেটা ম্যানেজমেন্ট এবং ত্রুটিহীন ডিজিটাল সিস্টেম তৈরির তাঁর সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকেই এবার কাজে লাগাতে চাইছে বর্তমান প্রশাসন। বর্তমান টাস্ক ফোর্সে তাঁর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে দেশের প্রখ্যাত কিছু মেধাবী মনকে—যাদের মধ্যে রয়েছেন ইসরোর প্রাক্তন চেয়ারম্যান এস সোমনাথ, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর প্রাক্তন ডিরেক্টর তপন ডেকা, আইআইটি মাদ্রাজের ডিরেক্টর ভি কামাকোটি, প্রাক্তন শিক্ষা সচিব অনিতা কারওয়াল এবং লজিস্টিক বিশেষজ্ঞ অমৃত লাল মীনা। ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট স্থাপন এবং কঠোর নতুন আইন আনার পাশাপাশি এই উচ্চপর্যায়ের প্যানেলটি প্রযুক্তিগতভাবে পরীক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও হ্যাকার-প্রুফ করার নকশা তৈরি করবে।
১৯৫৫ সালের ২ জুন বেঙ্গালুরুতে জন্মগ্রহণকারী নন্দন নিলেকানি আইআইটি বোম্বে থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার পর ১৯৭৮ সালে পাটনি কম্পিউটার সিস্টেমসে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে এন. আর. নারায়ণমূর্তি ও আরও কয়েকজন সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইনফোসিস’, যা আজকের দিনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি পরিষেবা সংস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ইনফোসিসের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি কোম্পানির বিশ্বজোড়া বাজার সম্প্রসারণে বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ফোর্বসের রিয়েল-টাইম তথ্য অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ আনুমানিক ২.৪ বিলিয়ন ডলার, যা তাঁকে ভারতের অন্যতম সফল ও ধনী ব্যক্তিত্বের তালিকায় স্থান দিয়েছে। ব্যবসায়িক সাফল্য ছাপিয়ে জনসেবা এবং প্রযুক্তির মেলবন্ধনে নিলেকানির এই নতুন যাত্রা ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় সঙ্কট মোচন করতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।