বর্ষার জমা জলে লুকিয়ে মারণ ‘ইঁদুর জ্বর’! সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবে ভুল করলেই ডেকে আনছেন মৃত্যুর পরোয়ানা!

ভারতের বিভিন্ন অংশে প্রবল বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং নিকাশি ব্যবস্থার অবনতির ফলে জমে থাকা জলাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসকরা লেপ্টোস্পাইরোসিস বা সাধারণত যা ‘ইঁদুর জ্বর’ বা ‘ব়্যাট ফিভার’ নামে পরিচিত, তা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা জারি করেছেন। বর্ষার এই মরশুমে যেকোনো সাধারণ জ্বরকে অনেকেই স্রেফ ভাইরাসজনিত সাধারণ অসুস্থতা বলে ভুল করে থাকেন। ক্লান্তিবোধ, তীব্র মাথাব্যথা বা শারীরিক দুর্বলতাকে মানুষ সাধারণত আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার ফল বলেই ধরে নেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ধারণা সঠিক হলেও, কখনও কখনও সেই আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ বলে মনে হওয়া জ্বরই হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী ‘ইঁদুর জ্বর’। এটি একটি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যার সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হলে তা রোগীর জীবন পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারে।
লেপ্টোস্পাইরোসিস মূলত ‘লেপ্টোস্পাইরা’ নামক এক বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার কারণে ছড়িয়ে থাকে। এর নাম ‘ইঁদুর জ্বর’ হলেও, এটি কেবল ইঁদুরের কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায় না। সংক্রামিত প্রাণী—বিশেষ করে ইঁদুরের মূত্র দ্বারা দূষিত জল, ময়লা কাদা বা মাটির সরাসরি সংস্পর্শে এলে মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। আমাদের শরীরের ত্বকের কোনো ছোটখাটো কাটাছেঁড়া, পুরনো আঁচড় অথবা চোখ, নাক ও মুখের মতো সংবেদনশীল অংশের মাধ্যমে এই মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং বর্ষার দিনে এই রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, কারণ সেই সময় দূষিত জল রাস্তাঘাট, কৃষিজমি এবং আবাসিক এলাকার অলিগলিতে থিকথিকে কাদার সঙ্গে জমে থাকে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও কেরালা, মহারাষ্ট্রের মুম্বই, কর্ণাটক, গুজরাট, তামিলনাড়ু এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে এই ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
কারা সবথেকে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন? সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট কিছু পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এর সহজ শিকারে পরিণত হন। যাঁদের দৈনন্দিন কাজের খাতিরে প্রবল বর্ষার জমা জল বা কর্দমাক্ত পরিবেশের মধ্যে কাজ করতে হয়, তাঁদের ঝুঁকির মাত্রা সবথেকে বেশি। এই তালিকায় রয়েছেন জলমগ্ন জমিতে কর্মরত খেতমজুর ও কৃষকরা, পুরসভার সাফাই কর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা, মৎস্যজীবীরা এবং বন্যা কবলিত প্লাবিত এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা। চিকিৎসকদের মতে, সামান্য অবহেলা করে এই দূষিত জলে খালি পায়ে হাঁটলে সংক্রমণের আশঙ্কা কয়েকশো গুণ বেড়ে যায়।
সবথেকে আশঙ্কার বিষয় হলো, ইঁদুর জ্বরকে সাধারণ ফ্লু বা ভাইরাল ফিভার বলে ভুল করা অত্যন্ত সহজ। আর এই ভুলের জন্যই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগের লক্ষণগুলি অন্য যেকোনো সাধারণ ভাইরাসের আক্রমণের মতোই প্রকাশ পায়। এর প্রধান প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত চড়া মাত্রায় উচ্চ জ্বর, অসহ্য মাথাব্যথা, পেশি ও হাড়ের মধ্যে তীব্র যন্ত্রণা এবং চরম ক্লান্তি। বেশিরভাগ মানুষই এই লক্ষণগুলোকে সামান্য ঋতু পরিবর্তনের ফল ভেবে এড়িয়ে যান কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই নিজে নিজে দোকান থেকে ওষুধ কিনে খেয়ে নেন। এটি আপনার জীবনের অন্যতম মারাত্মক ভুল হতে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না করা হলে এই ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ লিভার, কিডনি, ফুসফুস এবং মস্তিষ্কের মতো শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে চিরতরে বিকল করে দিতে পারে। চরম পরিস্থিতিতে এটি আকস্মিক জীবনহানির কারণও হতে পারে।
এই মারণ রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকতে কিছু সাধারণ অথচ কঠোর সতর্কতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। বর্ষার জমে থাকা জল বা কাদার মধ্যে কখনো খালি পায়ে হাঁটবেন না। যদি একান্তই বাইরে জল ভেঙে কাজ করতে হয়, তবে অবশ্যই ভালো মানের জলরোধী জুতো বা গামবুট ব্যবহার করুন। সবসময় ফোটানো কিংবা সঠিকভাবে ফিল্টার করা জল পান করার অভ্যাস করুন। বাড়ির আশপাশের পরিবেশ সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন এবং বাড়ির অন্দরে ইঁদুরের উপদ্রব শক্ত হাতে দমন করুন। দূষিত জলের সংস্পর্শে আসার পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত-পা ধুয়ে ফেলুন। দক্ষিণ কন্নড় জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ এইচ. আর. থিমাইয়া সতর্ক করে বলেছেন যে, প্রাথমিক পর্যায়ে র্যাট ফিভারকে একটি সাধারণ সংক্রমণ বলে মনে হলেও, চিকিৎসায় সামান্য দেরি হলে তা অত্যন্ত মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। তাই বর্ষার যেকোনো জ্বরকে অবহেলা না করে সচেতন থাকুন।