স্বামী-স্ত্রীর আয় সমান হলে কি খোরপোশ দেওয়া বাধ্যতামূলক? জানুন আইনের খুঁটিনাটি

বিবাহবিচ্ছেদের পর এক পক্ষ অপর পক্ষকে কত টাকা খোরপোশ বা অ্যালিমনি (Alimony) দেবেন, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে ঘোরাফেরা করে। ভারতে এই বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট বা বাঁধাধরা ফর্মুলা নেই। প্রতিটি মামলার আলাদা পরিস্থিতি ও তথ্যপ্রমাণ বিচার করে আদালত এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং ‘ম্যাগনাস লিগ্যাল সার্ভিসেস এলএলপি’-র পার্টনার নিকিতা আনন্দের মতে, ভারতে খোরপোশ নির্ধারণের সময় স্বামী-স্ত্রীর আর্থিক অবস্থা, আয়ের ক্ষমতা এবং বৈবাহিক জীবনে তাঁদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হয়।

আদালতের বিচার্য বিষয়গুলি কী কী?

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শ্রীসত্য মহান্তির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, খোরপোশ বা ভরণপোষণ নির্ধারণের সময় আদালত মূলত নিচের বিষয়গুলি বিবেচনা করে:

  • স্বামী-স্ত্রীর বর্তমান আয় ও আর্থিক অবস্থা

  • সমাজে উভয়পক্ষের জীবনযাত্রা ও সামাজিক অবস্থান

  • বিবাহিত জীবনে একে অপরের প্রতি আচরণ ও ব্যক্তিগত খরচ

  • শিশু বা বয়স্ক নির্ভরশীল সদস্যদের দেখভালের দায়িত্ব

  • বিবাহকালীন জীবনযাত্রার মান এবং চাকরি বা উপার্জনের সক্ষমতা

  • সম্পত্তি, স্বাধীন আয়ের উৎস এবং পরিবারের জন্য একজনের করা আত্মত্যাগ বা অবদান

  • অ-উপার্জনকারী জীবনসঙ্গীর আইনি খরচ এবং স্বামীর মোট আয় ও ঋণের পরিমাণ

স্বামী-স্ত্রীর আয় সমান হলে কি খোরপোশ দেওয়া বাধ্যতামূলক?

সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে যে, খোরপোশের মূল উদ্দেশ্য হলো নির্ভরশীল জীবনসঙ্গীকে আর্থিক সুরক্ষা প্রদান করা, কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়। উদাহরণস্বরূপ, স্বামী ও স্ত্রী দু’জনেই যদি সমানভাবে মাসে ১ লক্ষ টাকা করে উপার্জন করেন এবং তাঁদের জীবনযাত্রার মান প্রায় একই থাকে, তবে সাধারণত খোরপোশ দেওয়া বাধ্যতামূলক হয় না। তবে সন্তানের দায়িত্ব বা অন্য কোনো অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা যদি একজনের ওপর বেশি থাকে, তবে আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে আর্থিক সহায়তার নির্দেশ দিতে পারে।

স্বামীরাও কি খোরপোশ দাবি করতে পারেন?

সাধারণত খোরপোশের দাবি স্ত্রীদের তরফ থেকেই করা হয়ে থাকে। তবে ভারতীয় আইনি ব্যবস্থায় বিশেষ ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে স্বামীরাও খোরপোশ দাবি করতে পারেন

  • হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫-এর ২৪ ও ২৫ ধারায় স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই খোরপোশ চাওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে।

  • তবে বিশেষ বিবাহ আইন (১৯৫৪), ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (২০২৩), হিন্দু দত্তক ও ভরণপোষণ আইন (১৯৫৬) এবং গার্হস্থ্য হিংসা থেকে মহিলাদের সুরক্ষা আইনের মূল লক্ষ্যই হলো মূলত স্ত্রীর ভরণপোষণ সুনিশ্চিত করা।

  • আইনজীবী শ্রীসত্য মহান্তির মতে, কোনো স্বামী যদি শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সম্পূর্ণ উপার্জন অক্ষম হন এবং তিনি আদালতে প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি স্ত্রীর ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন, তবেই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে আদালত তা বিবেচনা করতে পারে।

বিদেশের আইনে কী নিয়ম রয়েছে?

বিশ্বের অন্যান্য দেশে খোরপোশ বা অ্যালিমনি নির্ধারণের নিয়মে বেশ কিছু ভিন্নতা দেখা যায়:

  • আমেরিকা: কিছু নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যে নির্দিষ্ট ফর্মুলা থাকলেও, অন্য জায়গায় বিবাহিত জীবনের সময়কাল ও উপার্জনের ক্ষমতা খতিয়ে দেখা হয়।

  • ব্রিটেন: আদালতের প্রধান লক্ষ্য থাকে সম্পূর্ণ ন্যায্যতা বজায় রাখা, যাতে বিচ্ছেদের পরেও উভয় পক্ষই যুক্তিসংগত জীবনযাত্রা বজায় রাখতে পারেন।

  • জার্মানি ও ফ্রান্স: এই দেশগুলিতে সাধারণত স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সহায়তার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়।

  • চীন ও জাপান: এই দেশগুলিতে মাসিক খোরপোশের বদলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এককালীন আর্থিক নিষ্পত্তি (One-time Settlement)-কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।