মহাকাশ থেকে নিসারের ক্যামেরায় ধরা পড়ল এ কোন রহস্য! আন্টার্কটিকার বরফের নিচে বিশাল ডানায় কি লুকিয়ে অচেনা ভিনগ্রহের বার্তা?

হাকাশ বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এক অভূতপূর্ব ও রোমাঞ্চকর আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর যৌথ উদ্যোগে তৈরি সর্বাধুনিক কৃত্রিম উপগ্রহ ‘নিসার’ (NISAR)। মহাকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে তাক করে রাখা এই স্যাটেলাইট একের পর এক অত্যন্ত বিস্ময়কর ছবি ও তথ্য পাঠিয়েই চলেছে। তবে এবার নিসারের পাঠানো একটি অত্যাধুনিক রাডার ছবি বৈজ্ঞানিক মহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পূর্ব আন্টার্কটিকার পুরু বরফের স্তরের বহু গভীরে এই রাডার চিত্রের মাধ্যমে হদিস মিলেছে একটি বিশাল আকৃতির হামিংবার্ড বা ছোট্ট পাখির ডানার মতো অদ্ভুত এক কাঠামোর। বরফের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ভূ-প্রকৃতির এমন স্পষ্ট ও পরিষ্কার চিত্র কীভাবে ধরা পড়ল, তা নিয়ে এখন চলছে জোরদার গবেষণা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।

কী এই নিসার প্রকল্প?

নাসা এবং ইসরোর যৌথ ও অত্যন্ত महत्त्वाकांक्षी বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টার ফসল হলো এই নিসার উপগ্রহ। প্রায় একটি পিকআপ ট্রাকের সমান সুবিশাল আকারের এই স্যাটেলাইটটি গত ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে মহাশূন্যের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। প্রায় দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপুল ব্যয়ে নির্মিত এই মিশনটি বিশ্বের এমন প্রথম কোনো রোমাঞ্চকর উপগ্রহ যেখানে দুটি ভিন্ন ও অত্যন্ত শক্তিশালী রাডার প্রযুক্তির সফল সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। এর মধ্যে নাসার তৈরি ‘এল ব্যান্ড’ রাডার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ঘন জঙ্গল এবং বরফের পুরু গভীরতা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। অন্যদিকে, ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর তৈরি ‘এস ব্যান্ড’ রাডার মূলত কৃষিজমি, গুল্মক্ষেত্র এবং মাটির আর্দ্রতা নির্ভুলভাবে পরিমাপ করতে পারদর্শী।

বরফের নিচে হঠাৎ হামিংবার্ড আকৃতি কেন?

বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিসার উপগ্রহের শক্তিশালী এল-ব্যান্ড রাডারের সাহায্যেই পূর্ব আন্টার্কটিকার ‘নুনাটক জাটেরজাভশিজসজা’ নামক একটি পর্বতশৃঙ্গের অত্যন্ত স্পষ্ট ছবি পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। উল্লেখ্য, এই সুবিশাল পর্বতটি হিমবাহের বিশাল বরফস্তরের নিচে আংশিকভাবে সম্পূর্ণ ঢাকা রয়েছে। যখন হিমবাহ বা বরফের নদী অত্যন্ত ধীর গতিতে ওই পর্বতের পাশ দিয়ে গড়িয়ে চলে, তখন চরম ও প্রবল চাপের কারণে বরফের ভেতরে গভীর ও জটিল ফাটলের সৃষ্টি হয়। নিসারের রাডার চিত্রে এই বিশেষ ফাটলগুলি উজ্জ্বল সবুজ রেখা হিসেবে ধরা পড়েছে। এই সমস্ত ফাটল এবং বরফের গঠন একত্রিত হয়ে পুরো ছবিটিকে ডানা মেলে উড়ে চলা একটি হামিংবার্ড পাখির অবয়ব দান করেছে, যার জেরে বিজ্ঞানীরা এই আকৃতিটিকে ভালোবেসে ‘হামিংবার্ড’ নাম দিয়েছেন।

এই আবিষ্কার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

নাসার অন্যতম বিশিষ্ট সিগন্যাল অ্যানালিসিস ইঞ্জিনিয়ার সিয়ংসু জিয়ং সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, সাধারণ অপটিক্যাল ক্যামেরা যেখানে কেবল বরফের ওপরের চকচকে আস্তরণটি দেখতে পায়, সেখানে রাডার প্রযুক্তি তুষার ও বরফের অনেক গভীর পর্যন্ত ভেতর ভেদ করে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে আন্টার্কটিকার বরফস্তরের অভ্যন্তরীণ এমন সব জটিল বৈশিষ্ট্য ও গোপন গঠন উন্মোচিত হওয়া সম্ভব হচ্ছে যা আজ পর্যন্ত মানবজাতির অজানা ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, আন্টার্কটিকার বুকে খুঁজে পাওয়া এই হামিংবার্ড আকৃতির চিত্রটি নিসারের অবিশ্বাস্য ও অসাধারণ ক্ষমতার কেবল একটি ছোট্ট ঝলক মাত্র। আগামী দিনে এই শক্তিশালী উপগ্রহ পৃথিবীর বুকে লুকিয়ে থাকা বহু প্রাচীন ও অজানা প্রাকৃতিক পরিবর্তন আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরবে বলে প্রবল আশাবাদী জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty