যন্তর মন্তরের মেলায় তিল ধারণের জায়গা নেই! লাখো মানুষের এই ভিড়ের নেপথ্যে কোন বড় রহস্য?

মধ্যপ্রাচ্যের আবহ থেকে শুরু করে দিল্লির রাজনীতি—সব মিলিয়েই যেন এক অদ্ভুত অস্থিরতার ছবি ধরা পড়ছে। কিশোর কুমারের গানে কুঞ্জছায়ার মায়ার মতো যন্তর মন্তরের ভাঙা মেলায় এসে সাংবাদিক মন কেবলই খুঁজছিল আসল সূত্রটা। লাখো-লাখো মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত কি নিছকই বিদেশ থেকে আসা ফান্ডিং বা উস্কানির ফল? বিজেপি বিরোধী জনসাধারণের কাছে বিগত দেড় মাসের ভারত যেন এক খোলা মাঠ হয়ে উঠেছিল, যেখানে যার মতো করে ক্ষোভ উগরে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই বিশাল গণআন্দোলনের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে বেশ কিছু গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ। চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং খাস দিল্লির রাজপথের এই আন্দোলন এক নতুন মোড় নিয়েছে। শনিবার দুপুরে হঠাৎ করেই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে যায়। এর পরেই কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সিজেপির উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং অবশেষে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই কার্নিভালসুলভ আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষের পথে পৌঁছানোর পরেও রাত প্রায় সাড়ে দশটা পর্যন্ত যন্তর মন্তরে সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। চারিদিকে বিভিন্ন দল বা গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে নাচ-গান থেকে শুরু করে দড়ি টানাটানির মতো খেলায় মত্ত হতে দেখা গেছে তরুণ প্রজন্মকে, যা দেখে মনে হচ্ছিল এত দীর্ঘ লড়াইয়ের পরেও তাদের শরীরে অফুরন্ত শক্তি ও জেদ বজায় রয়েছে।

এই আন্দোলনের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বর্তমান রাজনৈতিক ময়দানে বিশ্বাসযোগ্য মুখ বা প্রকৃত বিজেপি বিরোধীর তীব্র শূন্যস্থান। সাধারণ মানুষের চোখে এমন কোনো বিরোধী নেতা অবশিষ্ট নেই যাঁর গায়ে দুর্নীতির কোনো কালি বা কলঙ্কের দাগ নেই। সেই কাঙ্ক্ষিত শুদ্ধ স্বরই মানুষ খুঁজে পেয়েছে এই নতুন প্রজন্মের আন্দোলনের ভিড়ে। তবে সবথেকে বড় প্রশ্ন হলো, এই তরুণ প্রজন্মের তরুণ রক্তের আবেগ শেষ পর্যন্ত কতটা শুদ্ধ থাকবে? সিজেপির মুখপাত্র সৌরভের পূর্বঘোষিত বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দলকেই এই আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল। শুরুর দিকে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি সেই ডাকে কোনো পাত্তা না দিলেও, যখন আন্দোলনের পারদ চড়তে শুরু করে, তখন একে একে বিরোধী শিবিরের হেভিওয়েট নেতারা হাজির হতে শুরু করেন। অখিলেশ যাদব, ডিম্পল যাদব, মেহবুবা মুফতি, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মহুয়া মৈত্র থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও সেখানে যোগ দেওয়ার কথা পাকা ছিল। যদিও তার আগেই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, জেন-জি আন্দোলনের এই চলন্ত নৌকায় সওয়ার হয়ে বিরোধী দলগুলিও এবার সংসদীয় রাজনীতির অন্দরে উত্তাপ বাড়াতে শুরু করেছে। সকলেরই স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে এক এবং অভিন্ন—ধর্মেন্দ্রর পদত্যাগ। মূলত সিজেপির জনপ্রিয় স্লোগানগুলিকে যেন রাজনৈতিক দলগুলি আক্ষরিক অর্থেই ভাড়া করে নিয়েছে।

প্রথম সারির রাজনৈতিক দলগুলোকে কেন আজ এই পরিস্থিতিতে পড়তে হলো? বামপন্থী দলগুলি ছাড়া এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া বাকি সমস্ত রাজনৈতিক দলই কার্যত বহিরাগত শক্তির মতো উপস্থিত থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছে। ভরা সমুদ্রে খড়কুটোর মতো এই গণআন্দোলনের পিঠে ভর দিয়ে বিরোধী দলগুলি সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেদের মৃতপ্রায় শক্তি ফিরে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, সমসাময়িক ইস্যু তো চারপাশেই খোলা ছিল, তা সত্ত্বেও কেন এই ঐতিহ্যবাহী দলগুলো সাধারণ মানুষকে এভাবে নিজের ছাতার তলায় জড়ো করতে ব্যর্থ হলো? এর একমাত্র উত্তর হলো—বিশ্বাসযোগ্যতার চরম অভাব। আজ দেশের সাধারণ মানুষের প্রথাগত রাজনৈতিক দলের কাঠামো এবং তাদের শীর্ষ নেতৃত্বদের প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা বা ভরসা অবশিষ্ট নেই। মানুষ প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন কিছু দেখতে ও পেতে চায়। আর সেই নতুনত্বের পথ ধরেই আত্মপ্রকাশ করেছে সিজেপি, যার ওপর সাধারণ মানুষ পুনরায় ভরসা রেখেছে। তবে সিজেপির এই সাজানো বাগান থেকে ফুল তুলে নিজেদের রাজনৈতিক ফুলদানি সাজানোর যে চিরাচরিত ফর্মুলা কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি বা বামেরা প্রয়োগ করছে, তা আদতে তাদের কোনো বড় রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ দেবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মনে গভীর সন্দেহ থেকেই যায়।

আপাতত দিল্লির রাজপথ শান্ত হয়েছে, সমস্ত বন্ধ রাস্তাঘাট আবার খুলে দেওয়া হয়েছে এবং মেট্রো পরিষেবাও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। আগামী কয়েকদিন হয়তো এই প্রতিবাদের কিছু বিচ্ছিন্ন ‘আফটারশক’ বা রাজনৈতিক কর্মসূচি বিক্ষিপ্তভাবে চলবে। কিন্তু তারপরে আসল প্রশ্নটা থেকেই যায়—দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও বিশ্বাসভঙ্গের সুদীর্ঘ অতীত মাথায় নিয়ে এই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কি আদৌ এই লড়াকু মনোভাবকে আসন্ন ভোটের ময়দানে সফলভাবে নিয়ে যেতে পারবে? অন্যের নৌকায় পা রেখে নদী পার হওয়ার ফন্দি আঁটার চেয়ে, বিগত দিনে যদি তারা নিজেদের নৌকার ভাঙা ফুটো গুলো সারাই করার সুযোগ পেত, তবে হয়তো রাজনৈতিক ফলাফল অন্যরকম হতে পারত। নতুবা অচিরেই এই দেওয়াল লিখনও মুছে যাবে। সোশ্যাল মিডিয়া ও ইনস্টাগ্রামের রিলস বানিয়ে যতটুকু সম্ভব তরুণ প্রজন্ম করে দেখিয়েছে। কিন্তু বাকি রাজনৈতিক দলগুলি যদি কেবল অন্যের সাফল্য থেকে মধু খেয়ে চুপচাপ বসে থাকে, তবে আগামী দিনের নির্বাচনেও বিরোধী দলনেতাদের ফের ইউরোপের মাটিতে পালিয়ে গিয়ে ছুটি কাটাতে বাধ্য হতে হবে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty