ভারতের মুকুটে যুক্ত হল আরও এক নতুন গৌরব! ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় জায়গা করে নিল কোন ঐতিহাসিক স্থান?

ভারতের সমৃদ্ধ ও প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভাণ্ডারে যুক্ত হলো আরেকটি অত্যন্ত উজ্জ্বল রত্ন। বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম পবিত্র ও প্রধান তীর্থস্থান বারাণসীর নিকটবর্তী সারনাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানের (UNESCO World Heritage Site) মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সারনাথ ভারতের ৪৫তম বিশ্ব ঐতিহ্য ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি লাভ করল। সম্প্রতি গত ২৫শে জুলাই ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ৪৮তম বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে এই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। সংশ্লিষ্ট সরকারি আধিকারিক ও কূটনৈতিক মহলের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, সুপরিকল্পিত রূপরেখা এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক অনুসরণের ফলেই এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতি অর্জন সম্ভব হয়েছে।

ইতিহাস ও প্রমাণের পাতা উল্টালে দেখা যায়, উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর অত্যন্ত কাছে অবস্থিত সারনাথের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের আদি ইতিহাস। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে দেবাদিদেব গৌতম বুদ্ধ বোধিপ্রাপ্তির পর এই পবিত্র মাটিতেই প্রথম ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন’ বা তাঁর প্রথম বাণী প্রচার করেছিলেন। প্রাচীনকালে মৃগদাব বা ‘ডিয়ার পার্ক’ (Deer Park) নামে পরিচিত এই বিশেষ স্থানেই মহাত্মা বুদ্ধ তাঁর প্রথম পাঁচ জন সন্ন্যাসী শিষ্যকে অমর উপদেশ দিয়েছিলেন। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিশ্বাস অনুযায়ী, সারনাথের এই মাটিতেই বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রার শুভ সূচনা হয়েছিল। সারনাথের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বখ্যাত প্রাচীন ধমেক স্তূপ, ভারতের জাতীয় প্রতীকের উৎস সম্রাট অশোকের বিখ্যাত সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভের অবশেষ এবং প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার ও মঠের বিশাল ধ্বংসাবশেষ। এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব ও প্রাচীন স্থাপত্যের অবয়ব সারা বিশ্বের গবেষক ও ইতিহাসবিদদের বরাবরই আকৃষ্ট করেছে। এমনকি প্রাচীন চীনের বিখ্যাত পর্যটক ও পরিব্রাজক ফা-হিয়েন এবং হিউয়েন সাং-এর ঐতিহাসিক ভ্রমণ বিবরণীতেও সারনাথের সমৃদ্ধির বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়।

ইউনেস্কোর এই মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতির মাধ্যমে মূলত সারনাথের সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক, অতুলনীয় সাংস্কৃতিক এবং স্থাপত্যগত মূল্যের আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন ঘটল। এই পবিত্র স্থানটি কেবল ভারতের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের বৌদ্ধ সংস্কৃতির এক অমূল্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিরাট সাফল্যে গভীর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এটিকে প্রতিটি ভারতবাসীর জন্য অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিশ্বমঞ্চে ভারতের সুপ্রাচীন সভ্যতা, কৃষ্টি এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে আরও অনেক বেশি উজ্জ্বল ও মহিমান্বিত করে তুলবে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের আধিকারিকরা জানিয়েছেন যে, এই স্বীকৃতির সুবাদে এখন সারনাথের সার্বিক সংরক্ষণ, আধুনিক উন্নয়ন এবং বিশ্বমানের পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও তহবিল প্রাপ্তির পথ উন্মুক্ত হলো।

এই অভূতপূর্ব সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও দূরদর্শী উদ্যোগ। গত কয়েক বছর ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য, আধুনিক পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং সারনাথ চত্বরের সুচারু সংরক্ষণে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ বিভাগ বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (ASI) অত্যন্ত নিখুঁত ও যত্নশীলভাবে এই ঐতিহাসিক স্থানের রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছে। একই সঙ্গে, রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার ফলে সারনাথ আজ কেবল একটি সনাতন ধর্মীয় তীর্থক্ষেত্র হিসেবেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি আধুনিক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও বিশ্ববাসীর কাছে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ভারত ইতিমধ্যেই ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় সর্বাধিক স্থানাধিকারী দেশগুলির মধ্যে অত্যন্ত গৌরবজনক স্থানে রয়েছে। সারনাথের নতুন করে এই অন্তর্ভুক্তির ফলে ভারতের এই তালিকায় থাকা মোট ঐতিহ্যবাহী স্থানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫-এ। এর আগে অজন্তা-ইলোরা গুহা, অমর তাজমহল, কোনার্কের সূর্য মন্দির, দিল্লির লাল কেল্লা, কর্ণাটকের হাম্পি, নালন্দা মহাবিহারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অজস্র ঐতিহ্যবাহী স্থান এই বিশ্ব তালিকায় নিজেদের নাম খোদাই করেছে।