চিতোরগড় জেলে রিলস বানানোর হিড়িক! মদ-নাচে মত্ত বন্দিরা, জেলের ভেতর অ্যান্ড্রয়েড ফোন পৌঁছাল কী করে?

রাজস্থানের চিতোরগড় জেলা কারাগার থেকে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাঁস হওয়া তিনটি চাঞ্চল্যকর ভাইরাল ভিডিও গোটা দেশজুড়ে প্রশাসনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে। ইন্টারনেটে ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওগুলিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, কুখ্যাত অপরাধী ও বিচারাধীন বন্দিরা জেলের চার দেয়ালের ভেতরে বসে দিব্যি আনন্দ-উল্লাস করছে, পার্টিতে মত্ত রয়েছে, মাদক সেবন করছে এবং হইচই করে নাচানাচি করছে। এই পুরো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং গুরুতর বিষয় হলো, একজন বন্দীকে একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে সেলফি ভিডিও তৈরি করতে দেখা গেছে। জেলের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে এই ধরনের বেআইনি সামগ্রী ভেতরে পৌঁছানো এবং বন্দিদের এমন বেপরোয়া আচরণ কারা প্রশাসনের ভেতরে চরম চাঞ্চল্য ও ভয়ের সৃষ্টি করেছে।
সূত্রের খবর অনুযায়ী এবং ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলির প্রাথমিক বিশ্লেষণে জানা গেছে যে, এই ভিডিওগুলিতে যে সমস্ত বন্দিকে প্রধানত উল্লাস করতে দেখা যাচ্ছে, তারা সকলেই গত বছর ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর অজয়রাজ সিং হত্যা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত। গত বছরের পহেলা জুন কোতোয়ালি থানা এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত এএসআই শিব সিং-এর পুত্র অজয়রাজ সিংকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এই হাই-প্রোফাইল হত্যা মামলায় পুলিশ ইতিমধ্যেই ৩২ জনেরও বেশি অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছে গাংরার থানা এলাকার দাগী অপরাধী ঈশ্বর সিং দাতে, ভৈরন ঝুনপাড়া এবং অন্যান্য সহযোগীরা। উল্লেখযোগ্যভাবে, চিতোরগড়ের স্থানীয় বিধায়ক চন্দ্রভান সিংকে এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে আসছে মৃত যুবকের পরিবার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি।
ভাইরাল হওয়া মোট তিনটি ভিডিওতে জেলের ভেতরের চরম অব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রথম ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে এক ডজনেরও বেশি বন্দি একসঙ্গে মেঝেতে বসে জমজমাট আয়োজনে খাবার খাচ্ছে। দ্বিতীয় ভিডিওটিতে কিছু বন্দিকে স্পষ্টতই মাদক সেবন করতে দেখা গেছে, যদিও রাসায়নিক বা নিষিদ্ধ দ্রব্যের সঠিক প্রকৃতি এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিতর্কিত ভিডিওটিতে বন্দিদের হিন্দি গানে কোমর দুলিয়ে নাচতে ও চরম উদযাপনে মেতে উঠতে দেখা যায়। এই ভিডিওগুলি সামনে আসার পরই কারা কর্তৃপক্ষের সেই সমস্ত পুরনো দাবি সম্পূর্ণ ভুয়ো প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে তারা বারবার বলে আসত যে কারাগারের ভেতরে কোনো রকম নিষিদ্ধ সামগ্রী বা মোবাইল ফোনের প্রবেশাধিকার নেই।
একটি সম্পূর্ণ অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন কীভাবে জেলের ভেতরে পৌঁছাল, তা নিয়ে এখন উচ্চপর্যায় তদন্ত শুরু হয়েছে। এর আগে অতীতে কারাগার থেকে ছোট ও সাধারণ মানের ফিচার ফোন উদ্ধারের টুকরো টুকরো খবর পাওয়া গেলেও, বর্তমান যুগে একটি ফুল-ফাংশনাল অ্যান্ড্রয়েড ফোন জেলের ভেতর থেকে ব্যবহার করা এবং ইনস্টাগ্রামে সেই ভিডিও আপলোড করে ভাইরাল করে দেওয়াকে অত্যন্ত গুরুতর নিরাপত্তা লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যদিও জেল প্রশাসন বা পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে এই ভাইরাল ভিডিওগুলির সত্যতা নিয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেওয়া হয়নি, তবুও ঘটনার গুরুত্ব বুঝে ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো এটি বের করা যে ভিডিওগুলো কবে ধারণ করা হয়েছিল, কোন দুর্নীতির মাধ্যমে বা কার সাহায্যে মোবাইল ফোনটি জেলের ভেতরে প্রবেশ করানো হলো এবং এই নজিরবিহীন নিরাপত্তা ত্রুটির জন্য ঠিক কারা দায়ী। এই ঘটনার ফলে রাজস্থানের সামগ্রিক কারাগার ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও নজরদারি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।