বিএসএফ ক্যাম্পে রক্তাক্ত তাণ্ডব! প্রহরীর রাইফেল কেড়ে সহকর্মীদের ওপর এলোপাথাড়ি গুলি বিচারাধীন জওয়ানের

দেশের সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত সেন্ট্রাল সিকিউরিটি ফোর্সের সদর দফতরের ভেতরেই ঘটে গেল এক নজিরবিহীন ও মর্মান্তিক রক্তক্ষয়ী কাণ্ড। কোর্ট মার্শালের বিচারাধীন এক বিএসএফ জওয়ান প্রহরীর রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে সহকর্মীদের লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালানোর অভিযোগে মারাত্মকভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে মালদহের বৈষ্ণবনগরের বিএসএফ ক্যাম্প। এই আকস্মিক ও বর্বরোচিত হামলায় ঘটনাস্থলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিন জওয়ান। দুর্ভাগ্যবশত, তাঁদের মধ্যে দু’জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন হুগলির এক জওয়ান। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার ঘেরাটোপে এমন লোমহর্ষক ঘটনায় গোটা এলাকায় চরম চাঞ্চল্য ও গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বৈষ্ণবনগরে বিএসএফের ১১৯ নম্বর ও ৭১ নম্বর ব্যাটালিয়নের যৌথ সদর দফতরে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় পুলিশ ও বিএসএফ সূত্রে বিস্তারিত তথ্য মিল-মিশ করে জানা গিয়েছে যে, অভিযুক্ত জওয়ানের নাম শিবম কুমার মিশ্র এবং তিনি মূলত ছত্তিশগড়ের বাসিন্দা। একটি নির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রক্রিয়াধীন কোর্ট মার্শালের কাজ চলছিল। সেই কারণেই তাঁকে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ব্যারাকের একটি নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে রাখা হয়েছিল।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, শৌচাগারে নিয়ে যাওয়ার সেই নির্দিষ্ট সময়ে কর্তব্যরত সেন্ট্রির ওপর হঠাৎ করেই চড়াও হন অভিযুক্ত শিবম এবং তাঁর হাত থেকে সার্ভিস রাইফেলটি ছিনিয়ে নেন। এরপর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তিনি পাশের ব্যারাক লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র ক্যাম্পে হুলুস্থুল কাণ্ড বেধে যায় এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে জওয়ানরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। কিন্তু তার আগেই ঘাতকের এলোপাথাড়ি গুলিতে রক্তস্নাত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অজয় কুমার সিংহ (৫১), আম্বদর সুরেশ দরগু (৩৭) এবং বিকাশ ব্রহ্ম (৪৩)।
গুলির বিকট শব্দ ও আকস্মিক চিৎকার শুনে ক্যাম্পের অন্যান্য জওয়ানরা দ্রুত ছুটে এসে সাহসিকতার সঙ্গে অভিযুক্তকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে আটক করেন। এরপর রক্তে ভেসে যাওয়া তিন জওয়ানকে দ্রুত উদ্ধার করে তড়িঘড়ি মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা বিহারের ছাপরা জেলার মানঝি এলাকার বাসিন্দা অজয় কুমার সিংহ এবং মহারাষ্ট্রের গড়চিরৌলির বাসিন্দা আম্বদর সুরেশ দরগুকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, গুরুতর ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন হুগলির পোলবা থানার মহানাদ চৌমাথা গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ ব্রহ্ম। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে যে তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। এই তিন জওয়ানই মূলত বিএসএফের ৭১ নম্বর ব্যাটালিয়নের সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার খবর হুগলির মহানাদে পৌঁছতেই গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। আহত জওয়ান বিকাশের স্ত্রী স্বপ্না ব্রহ্ম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান যে, প্রায় ২৫ বছরের বর্ণময় চাকরিজীবনে তাঁর স্বামী কাশ্মীর, পঞ্জাব ও অসমের মতো একাধিক অতি সংবেদনশীল এলাকায় অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁদের কখনও হতে হয়নি। তিনি জানান, মালদায় প্রায় দু’বছর ধরে তাঁর পোস্টিং ছিল এবং ১৫ দিনের ছুটি কাটিয়ে গত ৬ জুলাই তিনি কর্মস্থলে ফিরেছিলেন। ঘটনার দিন বিকেল চারটে থেকে তাঁর ডিউটি থাকার কারণে তিনি তার আগে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাতই বিকট শব্দ শুনে ঘর থেকে বেরোতেই এই মর্মান্তিক খবর আসে। তিনি আরও জানান, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে বিকাশ তাঁকে ফোনে বলেছিলেন, “চিন্তার কিছু নেই, আমি ঠিক আছি।” বিকাশের দাদা সুভাষ ব্রহ্ম অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানান যে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলেও তাঁরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।
এই নজিরবিহীন ঘটনার পরপরই বৈষ্ণবনগরের বিএসএফ সদর দফতরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও বহু গুণ জোরদার করা হয়েছে। মালদহের জেলা পুলিশ সুপার অনুপম সিং জানিয়েছেন যে ঘটনার উচ্চপর্যায়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার বেষ্টনীর মধ্যেও কী করে একজন বিচারাধীন জওয়ান প্রহরীর অস্ত্র এভাবে ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হলেন এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বড় গাফিলতি ছিল কি না, সে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের জোরালো অনুমান যে অভিযুক্ত শিবম কুমার মিশ্র দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। তবে কেবল এটিই হামলার একমাত্র কারণ কি না, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তদন্তকারী দল তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য, সাম্প্রতিক আচরণ এবং কোর্ট মার্শালের সমস্ত নথি অত্যন্ত খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছেন। তবে ঠিক কী অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এই বিচার প্রক্রিয়া চলছিল, সে বিষয়ে বিএসএফ কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এখনও মুখ খোলা হয়নি। শুক্রবার নিহত দুই জওয়ানের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সম্পন্ন হবে এবং তারপর সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁদের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়ার মতো অত্যন্ত দায়িত্বশীল বাহিনীর সদর দফতরের ভেতরেই এমন রক্তক্ষয়ী ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের মতো একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।