২৬ দিনের ঐতিহাসিক অনশনের অবসান! কেন্দ্রীয় সরকারের কোন বড় শর্তে মত দিলেন সোনম ওয়াংচুক?

টানা ২৬ দিনের দীর্ঘ ও ক্লান্তিহীন লড়াইয়ের পর অবশেষে অবসান ঘটল ঐতিহাসিক অনশনের। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে লিখিত আশ্বাস পাওয়ার পরেই নিজের সুদীর্ঘ আমরণ অনশন প্রত্যাহার করে নিলেন বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গুরুগ্রামের সুপরিচিত মেদান্তা হাসপাতালের বেডে বসে, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে ফলের রস খেয়ে নিজের অনশন ভাঙেন তিনি। এই গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন মুহূর্তটিতে তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী গীতাঞ্জলী অ্যাংমো এবং লাদাখ ‘অ্যাপেক্স বডি’-র শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বরা। সরকারের তরফ থেকে পাঠানো সেই লিখিত চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে, দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শান্তিপূর্ণ কর্মী এবং গত ২০ জুলাই আয়োজিত ‘চলো সংসদ’ পদযাত্রায় শামিল হওয়া তরুণ ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক আইনি পদক্ষেপ বা নতুন কোনো মামলা রুজু করা হবে না।

অনশন প্রত্যাহারের তাৎক্ষণিক পর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন সোনম ওয়াংচুক। সেখানে তিনি সরকারের পাঠানো সেই লিখিত আশ্বাসনামার মূল কপি সকলের সঙ্গে শেয়ার করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের চিঠিতে অত্যন্ত স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত ২০ জুলাই দিল্লির সংসদ অভিযান ও যন্তর মন্তরের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী যুবসমাজ ও পরীক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্র কোনো ধরনের পুলিশি হয়রানি বা নতুন আইনি মামলা না করার বিষয়ে সম্পূর্ণ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে। সোনম ওয়াংচুক সংবাদমাধ্যম ও দেশবাসীর উদ্দেশ্যে জানান যে, আন্দোলনকারী তরুণদের বিরুদ্ধে যাতে কোনোভাবেই কোনো এফআইআর বা পুলিশি দমনপীড়ন চালানো না হয়, সেই মূল দাবিতেই গত দু’দিন ধরে প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত দীর্ঘ ও কড়া দরকষাকষি চলছিল। সরকারের উচ্চস্তর থেকে সেই শর্ত নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া এবং লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় তিনি আর অনশন দীর্ঘায়িত না করে তা সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেন।

মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাসের বাইরেও মোদী সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু বড়সড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা গোটা দেশের শিক্ষা মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সাম্প্রতিক নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার রোধের রূপরেখা নিয়ে চলমান সংসদীয় অধিবেশনেই বিশেষ আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি, এই চাঞ্চল্যকর নিট কেলেঙ্কারির জেরে মানসিক অবসাদে ও চরম চাপে পড়ে যে সমস্ত হতভাগ্য ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেই সমস্ত শোকস্তব্ধ পরিবারগুলিকে যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত সহানুভূতিশীলভাবে বিবেচনা করা হবে। সোনম ওয়াংচুক জানান, তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় এবং দেশজুড়ে চলা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় ৬৫ জন সংসদ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে ও চিঠির মাধ্যমে তাঁকে অনশন প্রত্যাহার করার বিনীত অনুরোধ জানিয়েছিলেন। দেশের শান্তি বজায় রাখতে এবং সমস্ত দিক বিবেচনা করে তিনি সরকারের এই প্রতিশ্রুতির ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে অনশন ভঙের পথ বেছে নেন।

উল্লেখ্য, দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর নিট কেলেঙ্কারির সুনির্দিষ্ট ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত, শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মূল দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র পাশে দাঁড়িয়ে গত ২৮ জুন থেকে আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন এই প্রখ্যাত সমাজকর্মী। দীর্ঘ ছাব্বিশ দিনের এই নাওয়া-খাওয়া ছাড়া অনশনের জেরে তাঁর শরীর থেকে প্রায় এগারো কেজি ওজন হ্রাস পেয়েছিল এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। গত ১৮ জুলাই দিল্লি পুলিশ তাঁকে যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থল থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে প্রথমে সফদারজং হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেছিল। তাঁর এই অনশন প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক ঘটনাটিকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর অফিসিয়াল ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে লিখেছেন যে, চিকিৎসকদের কড়া পরামর্শ মেনে সোনম ওয়াংচুক যেন দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন এবং তাঁর শারীরিক স্বাস্থ্য সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করেন। যদিও সোনম ওয়াংচুক চিকিৎসকদের অনুরোধে তাঁর অনশন পর্ব সফলভাবে সমাপ্ত করেছেন, তবুও নিট দুর্নীতি কাণ্ডে অভিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির আন্দোলন এবং আইনি লড়াই আগামী দিনেও সমানভাবে অব্যাহত থাকবে বলেই সংগঠনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।