‘তিন মাস পর নতুন ঘর তুলব!’ সিকিমে কাজ করতে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু চা-শ্রমিকের, স্বপ্ন ভাঙল তরুণী স্ত্রীর

চালসা গোলাই থেকে বাঁ দিকে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাওয়া সরু পাকদণ্ডী পথ ধরেই প্রতিদিন পর্যটকের গাড়ি ছুটে যায় সামসিং, সুনতালেখোলা কিংবা রকি আইল্যান্ডের সবুজ উপত্যকার দিকে। কিন্তু সবুজ চা-বাগান পেরিয়ে রাস্তার ধারের ছোট্ট চার্চে ঘেরা কিলকোট চা-বাগানের ১১ নম্বর লাইনের ছবিটা এখন সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে আজ পর্যটকদের কোনো কোলাহল নেই, নেই জীবনের কোনো স্বাভাবিক ছন্দ। চারদিকে শুধু বুকফাটা কান্না, প্রতিটি বাড়ির উঠোনে নেমে এসেছে শোকের ভারী নীরবতা। কারও দরজায় ঝুলছে সাদা কাপড়, কোথাও আবার কফিন ঘিরে চলছে অন্তহীন হাহাকার। পাহাড়ি ঠান্ডা হাওয়ায় ঘুরেফিরে একটাই নির্মম প্রশ্ন ভেসে বেড়াচ্ছে, পেটের দায়ে যিনি একদিন ঘর ছেড়েছিলেন, তিনি আজ কেন ফিরলেন কফিনে মুড়ে? গত ২১ জুলাই সিকিমের নামচিতে এনএইচপিসির (NHPC) টানেলে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন বহু পরিযায়ী শ্রমিক। সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় জলপাইগুড়ির কিলকোট চা-বাগানেরই তিন তরতাজা যুবক— বিকেশ্বর ওঁরাও (৩৪), শিবা লহরা (২০) এবং গ্যাব্রিয়াল টিগ্গা চিরতরে হারিয়ে গেছেন। একসঙ্গে কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া পাঁচ বন্ধুর মধ্যে দু’জন অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে ফিরলেও, তিন জন আর ঘরের মাটিতে ফিরে আসতে পারেননি। ইতিমধ্যে মঙ্গলবার গভীর রাতে বিকেশ্বর ও শিবার কফিনবন্দি দেহ গ্রামে পৌঁছতেই গোটা এলাকা শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হল, গ্যাব্রিয়ালের দেহ এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাঁর পরিবার আজও বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছে, অন্তত শেষবারের মতো তারা যেন সন্তানের মুখখানি দেখতে পায়।
মাত্র কয়েক মাস আগেই খুব ঘটা করে বিয়ে হয়েছিল শিবা লহরার। অভাবের তাড়নায় তাদের মাথার ওপর ছিল একটি ভাঙাচোরা টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর, যেখানে সামান্য বর্ষা নামলেই ছাদ ফুটো হয়ে জল এসে পড়ত বিছানায়। স্ত্রীকে বিদায় দেওয়ার সময় শিবা বুকে হাত রেখে কথা দিয়েছিলেন, আর মাত্র তিনটি মাস তাঁকে কষ্ট করতে হবে। কাজ শেষ করে টাকা হাতে নিয়ে ফিরে এসে তিনি নতুন একটি পাকা ঘর তুলবেন, যাতে স্ত্রীকে আর এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে থাকতে না হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই রঙিন স্বপ্ন আর কোনোদিনও পূরণ হলো না। শিবার তরুণী স্ত্রী আজ সেই জলপড়া ভাঙা ঘরেই একা বসে রয়েছেন। ঘরের সেই ফুটো ছাদ দিয়ে আজও ঝরে পড়ছে বৃষ্টির জল, শুধু ফিরে আসেননি স্বামী শিবা। নতুন ঘর তো দূরের কথা, চোখের পলকে তছনছ হয়ে গেল এক নবদম্পতির সাজানো সংসার। কিলকোট বাগানেরই অন্য একটি বাড়িতে চলছে অন্য এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মৃত বিকেশ্বর ওঁরাওয়ের ছোট মেয়েটি এখনও বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার বাবা আর নেই। মঙ্গলবার সকালেও শেষবারের মতো বাবার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল তার। বিকেশ্বর মেয়েকে স্নেহের সুরে বলেছিলেন, তিনি বিকেলে টাকা পাঠাবেন এবং সেই টাকা দিয়ে মেয়ে যেন মেলা থেকে শখের পুতুল কিনে নেয়। অবুঝ শিশুটি হয়তো সারাদিন বাবার আশায় পথ চেয়ে বসেছিল, ভেবেছিল বিকেলে টাকা আসবে আর তার হাতে আসবে নতুন খেলনা। কিন্তু সেই বিকেল আর কোনোদিনই আসেনি, আসেনি কোনো টাকা বা খেলনাও। বিকেলে ফিরেছে কেবল বাবার নিথর কফিনবন্দি দেহ। বাবার নিস্প্রাণ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই ছোট্ট শিশুটি হয়তো এখনও বুঝতেই পারেনি যে, জন্মদিনের উপহার বা খেলনা কিনে দেওয়ার কথা যিনি দিয়েছিলেন, তিনি চিরকালের মতো না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া রাকেশ মাঝি ও নিশান ওঁরাওয়ের স্মৃতিতেও এখন শুধুই বিভীষিকা। একসঙ্গে কাজের টানে সিকিমে যাওয়া পাঁচ বন্ধুর মধ্যে রাকেশ টানেলের মুখের ঠিক কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন। বিস্ফোরণের ভয়াবহ অভিঘাতে তাঁর শরীরের একাধিক হাড় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বর্তমানে গ্যাংটকের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা রাকেশ অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও, চোখের সামনে বন্ধুদের মর্মান্তিক পরিণতি দেখার সেই দুঃস্বপ্ন এখনও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। চিকিৎসকদের মতে তাঁর জীবন রক্ষা পেলেও মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। অন্যদিকে, আরেক বন্ধু নিশান ওঁরাও সেদিন ভাগ্যের জোরেই বেঁচে যান। দুর্ঘটনার ঠিক আগেই সকালে মাথায় চোট পাওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ফলে তিনি সেই দুর্ভাগ্যজনক শিফটে টানেলে নামার সুযোগ পাননি। সেই দুর্ঘটনাজনিত চোটই সেদিন আক্ষরিক অর্থেই তাঁর জীবন রক্ষা করেছে। পরিবারের একমাত্র স্বস্তি বলতে, নিশান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু এই ব্যক্তিগত শোকের বাইরেও চা-বাগানের বৃহত্তর বাস্তব চিত্রটা ঠিক কতটা মর্মান্তিক, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে কিলকোট চা-বাগানের বাসিন্দা শ্রীলাল টোপ্পোর কথায়। কফিনবন্দি দেহ সমাধিস্থ করার পর তাঁর কণ্ঠে ছিল তীব্র ক্ষোভ আর অসহায়তা। তিনি আক্ষেপ করে জানান যে, পাহাড়ের চা-বাগানে সারা বছর স্থায়ী কাজ মেলে না। যে সামান্য মজুরি মেলে, তা দিয়ে বর্তমান বাজারদরে সংসার চালানো অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়ে প্রতিটি পরিবারের তরুণ প্রজন্মকে রুজিরুটির টানে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে হয়। কেউ যোগ দেন নির্মাণ শিল্পে, কেউ বা কাজ নেন বিপজ্জনক টানেল তৈরির কাজে। দু’মুঠো অন্নের আশায় বেরিয়ে পড়া সেই পথই আজ ধীরে ধীরে গরিব মানুষের জন্য মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে উঠছে।
শুধু কিলকোট বা চা-বাগানই নয়, সিকিমের এই ভয়াবহ টানেল দুর্ঘটনায় পাশের ইংডং চা-বাগানের শ্যাম ওঁরাও, নাগরাকাটার গ্রাসমোর এবং সুখানি চা-বাগানের একাধিক শ্রমিকের দেহও একে একে ফিরে এসেছে তাঁদের নিজ নিজ ঠিকানায়। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে শুধুমাত্র জলপাইগুড়ি ও নাগরাকাটা এলাকারই মোট ন’জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। খবরের কাগজের পাতায় বা টেলিভিশনের স্ক্রিনে এই মর্মান্তিক ঘটনা হয়তো নিছক একটি পরিসংখ্যান হিসেবে জায়গা পায়, যেখানে হেডলাইন লেখা হয় ‘মৃত ৯’। কিন্তু এই ঠান্ডা সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে নয়টি চূর্ণবিচূর্ণ সংসার, নয়জন মায়ের বুকফাটা অন্তহীন কান্না, নয়টি তরুণী স্ত্রীর চিরতরে ভেঙে যাওয়া সুখের স্বপ্ন এবং নয়টি নিষ্পাপ শিশুর অনাথ হয়ে যাওয়া এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন প্রান্তিক চা-শ্রমিক পরিবারের সন্তান। বাগানে অনিয়মিত কাজ, অত্যন্ত কম মজুরি এবং পেটের দায়ে সৃষ্ট চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাঁদের পরিবারকে ঠেলে দিয়েছিল শত শত কিলোমিটার দূরের এই অচেনা কর্মক্ষেত্রে। জীবনের ঝুঁকি জেনেও তাঁরা শুধু পরিবারের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতে গিয়েছিলেন। আজ সেই মানুষগুলোর শুধু কফিনবন্দি দেহগুলোই বাড়ি ফিরল, কিন্তু ফিরল না তাঁদের হাজারো অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি। কারও নতুন ঘর তৈরির স্বপ্ন, কারও মেয়ের আবদার করা খেলনা, কারও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ কিংবা সন্তানের পড়াশোনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ—সবকিছুই চিরকালের মতো চাপা পড়ে গেল সিকিমের টানেলের ধ্বংসস্তূপে। চা-বাগানের অভিজ্ঞ শ্রমিকদের একটাই আক্ষেপ, যদি পাহাড়ের মাটিতেই সারা বছর কাজের সংস্থান থাকত এবং সঠিক ন্যায্য মজুরি মিলত, তবে নিজের জীবন বাজি রেখে কাউকে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে যেতে হতো না। সিকিমের এই টানেল দুর্ঘটনা তাই কেবল একটি সাধারণ শিল্প দুর্ঘটনা বা প্রশাসনিক গাফিলতির নমুনা নয়; এটি উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের দীর্ঘদিনের চরম দারিদ্র্য, সামাজিক বঞ্চনা এবং তীব্র কর্মসংস্থানের সংকটের এক গভীর ও নির্মম প্রতিচ্ছবি।