মাত্র ৯ দিনের জন্য খালি হয় গুণ্ডিচা মন্দির! রথযাত্রার ফাঁকে পুরীর রাস্তায় কেন নামে এই অদ্ভুত আত্মা?

প্রভু জগন্নাথের পবিত্র রথযাত্রা উপলক্ষে আপনি কি এবার সশরীরে পুরীতে উপস্থিত হয়েছেন? কিংবা পুণ্যলগ্নে বাহুড়া যাত্রার সময় সেখানে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছেন? যদি আপনার পরিকল্পনা থেকে থাকে, তবে পুরীর এই অতি প্রাচীন ও আকর্ষণীয় লোককথা আপনার অবশ্যই জেনে রাখা উচিত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, রথযাত্রার মহাআড়ম্বরের সময় ‘বাবানা ভূত’ নামে এক অদ্ভুত আত্মা পুরো পুরী শহর জুড়ে ঘুরে বেড়ায়। পবিত্র রথযাত্রার দিনগুলিতে শহরের অলিগলিতে বা সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়ানোর সময় হয়তো কোনো অজানia ক্ষণে আপনারও এই অলৌকিক সত্তার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে! কিন্তু কে এই রহস্যময় বাবানা ভূত, আর কেনই বা সে কেবল রথযাত্রার বিশেষ দিনগুলিতেই প্রকাশ্যে আসে? এই নিয়ে ভক্তদের মনে কৌতূহলের অন্ত নেই।

পুরীর বিশ্বখ্যাত শ্রীমন্দিরই হলো দেবাদিদেব ভগবান জগন্নাথের নিত্য এবং প্রধান আবাসস্থল। সারা বছর ধরে তিনি সেখানেই বিখ্যাত ‘রত্ন সিংহাসন’-এ আসীন থেকে দেশ-বিদেশ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ ভক্তকে দর্শন দেন। তবে বছরের মাত্র একবার, পবিত্র রথযাত্রার মাহেন্দ্রক্ষণে, তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলভদ্র এবং ভগিনী সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে সুসজ্জিত রথে চড়ে শ্রীগুণ্ডিচা মন্দিরে গমন করেন। এই গুণ্ডিচা মন্দিরটি মূলত প্রভুর জন্মস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে টানা নয় দিন অবস্থান করার পর মহা সমারোহে অনুষ্ঠিত ‘বহুড়া যাত্রা’ বা উল্টোরথের মাধ্যমে তিনি পুনরায় নিজ ধাম শ্রীমন্দিরে ফিরে আসেন।

এদিকে, রথযাত্রার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত শ্রী গুণ্ডিচা মন্দিরের মূল গর্ভগৃহটি সারা বছর সম্পূর্ণ শূন্য পড়ে থাকে। প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে যে সমস্ত স্থানে মানুষের বসবাস থাকে না বা যে জায়গাগুলি খালি পড়ে থাকে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রেতাত্মা বা ভূতেরা নিজেদের আস্তানা গড়ে তোলে। এই প্রচলিত বিশ্বাসের সূত্র ধরেই লোকমুখে বিশ্বাস করা হয় যে, ‘বাবানা ভূত’ নামের এক আত্মা সারা বছর ধরে এই শ্রী গুণ্ডিচা মন্দিরের অন্দরেই অবস্থান করে। তবে এই আত্মাকে কোনোমতেই কোনো ভয়ানক, ক্ষতিকর বা অশুভ শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয় না। বরং স্থানীয় ভক্তদের ধারণা অনুযায়ী, তাকে খোদ ভগবান জগন্নাথের একনিষ্ঠ সেবক এবং তাঁর জন্মস্থানের পরম রক্ষক হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

রথযাত্রার পবিত্র সময় প্রভু জগন্নাথ যখন মহাসমারোহে শ্রীগুণ্ডিচা মন্দিরে এসে পৌঁছান, তখন লোককথা অনুযায়ী এই ‘বাবানা ভূত’ গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে আসে এবং পুরীর আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায়। পুরীর স্থানীয় প্রবীন ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই আত্মাটি মূলত সমুদ্রতীরে বিচরণ করতে ভালোবাসে এবং স্বর্গদ্বারের কাছে অবস্থিত বিখ্যাত ও প্রাচীন ‘সোলাখিয়া’ বটগাছের ডালে গিয়ে বিশ্রাম নেয়। এ-ও প্রচলিত আছে যে, এই অদ্ভুত আত্মাটি ঠিক বানরের মতো গাছের ডালপালার এদিক থেকে ওদিকে লাফালাফি করে বেড়ায়, যার ফলে প্রতিবার রথযাত্রার পবিত্র সময়ে ওই নির্দিষ্ট বটগাছের বেশ কিছু ডাল আপনাআপনি ভেঙে নিচে পড়ে যায়।

পুরীর রথযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই লোককথা মানুষের বিশ্বাস, পরম্পরা এবং লোকপ্রচলনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। অগুনতি মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস যে, রথযাত্রার ভিড়ে পুরীতে গেলেই এই রহস্যময় ‘বাবানা’ ভূতের দেখা মিলতে পারে। পুরীর রথযাত্রার বহুমুখী ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক, রোমাঞ্চকর এবং রহস্যময় প্রথাগুলোর মধ্যে এই লোককাহিনিটিকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা হয়।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty