পিকনিক থেকে ফেরার পথে বেপরোয়া ডাম্পারের ধাক্কা! মৃত বেড়ে ৫, দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত হত্যা?

মধ্যপ্রদেশের নরসিংহপুর জেলায় এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ পথদুর্ঘটনার খবর প্রকাশ্যে এসেছে। গত রবিবার সন্ধ্যায় একটি মনোরম পিকনিক স্পট থেকে ফেরার পথে দ্রুত গতিতে ছুটে আসা একটি বেপরোয়া ডাম্পার ট্রাকের সজোরে ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন তরুণ। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আরও একজন যুবক গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সুয়াটালা থানা এলাকার অন্তর্গত জবলপুর-ভোপাল জাতীয় সড়কের ওপর এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। হতাহত সমস্ত তরুণ সেদিন হাতিনালা জলপ্রপাতে পিকনিকের আনন্দ উপভোগ শেষে নিজেদের বাড়ি ফিরছিলেন।

প্রাথমিক পুলিশি তথ্য এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত রবিবার জবলপুরের শাহপুরা ও মানেগাঁও এবং নরসিংহপুরের বেশ কয়েকজন স্থানীয় যুবক আনন্দ করে পিকনিকের উদ্দেশ্যে হাতিনালা জলপ্রপাতে গিয়েছিলেন। সারাদিন আনন্দ করার পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে তাঁরা দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি দূর করতে জাতীয় সড়কের পাশে অবস্থিত একটি সাধারণ চায়ের দোকানে কিছুটা সময় থামেন। ঠিক সেই সময়ই একটি ঘাতক ডাম্পার বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিত গতিতে এসে তাঁদের সকলকে পিছন থেকে সজোরে ধাক্কা মারে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই চারজন তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়, যার ফলে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচে।

এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে বারপাতি গ্রামের বাসিন্দা জয়পাল লোধি (৩০) ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এছাড়াও পাওলা গ্রামের বাসিন্দা বীরেন্দ্র লোধি (২১), রাজেন্দ্র লোধি (৩২) ও রাজপাল লোধি (২০)-র অত্যন্ত মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁদের জবলপুর নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। এর পর তাঁদের শাহপুরা কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁদের মৃত বলে ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, জবলপুরের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নীরজ লোধি নামে আরও এক আহত যুবক সোমবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পাশাপাশি, অত্যন্ত গুরুতর জখম অবস্থায় আকাশ লোধি নামক অপর এক যুবক বর্তমানে সেই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন, এবং চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তাঁর শারীরিক অবস্থাও বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ও মর্মান্তিক ছিল যে আশেপাশের প্রত্যক্ষদর্শীরা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে গোটা এলাকায় হুড়োহুড়ি ও ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রসঙ্গে নরসিংহপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সন্দীপ ভুরিয়া গণমাধ্যমকে জানান, “ওই যুবকরা হাতিনালা জলপ্রপাত থেকে আনন্দ করে ফিরছিলেন এবং চা খাওয়ার জন্য জাতীয় সড়কের ধারে দাঁড়িয়েছিলেন। গত রবিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৭টা ১৫ মিনিটের মধ্যে একটি দ্রুতগামী ডাম্পার ট্রাক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ছয়জন যুবককে নির্মমভাবে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। পলাতক ডাম্পার চালককে দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ প্রশাসন স্থানীয় সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে।”

তবে পুলিশের প্রাথমিক তত্ত্বকে নস্যাৎ করে নিহত সমাজবাদী পার্টি নেতা রাজেন্দ্র লোধির পরিবার এই ঘটনাকে সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা বলে মানতে নারাজ। পরিবারের জোরালো দাবি, এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যা। নিহত রাজেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকার অবৈধ বালি মাফিয়াদের বেআইনি কারবারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালোভাবে সরব হয়েছিলেন, আর সেই কারণেই তাঁকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে।

রাজ্যের সমাজবাদী পার্টির নেতা আশিস মিশ্রও একই সুরে আক্রমণ শানিয়ে দাবি করেছেন, “নিহত রাজেন্দ্র প্যাটেল ওরফে লোধি সমাজবাদী পার্টির মুলায়ম যুব শাখার রাজ্য সভাপতি পদের দায়িত্বে ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় অবৈধ বালি উত্তোলনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সেই কারণেই তাঁকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।” ঘটনার সপক্ষে একটি চাঞ্চল্যকর ভিডিও দেখিয়ে আশিস মিশ্র অভিযোগ করেন যে, ঘাতক ডাম্পারটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেবল রাজেন্দ্র ও তাঁর সঙ্গীদেরই পিষে দেয় এবং চালক ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কোনো সম্পত্তির ক্ষতি না করেই অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ট্রাকটি ঘুরিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগের পর গোটা এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে।