দেশমাতৃরূপের বন্দনাই কি অপরাধ? নতুন জাতীয় সংগীত বিলে চরম ক্ষোভ প্রকাশ মুসলিম নেতাদের!

সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আনতে চলেছেন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ‘প্রিভেনশন অফ ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। এই বিতর্কিত ও নতুন বিলের মাধ্যমে জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’-এর যেকোনো ধরনের অবমাননাকে কঠোরভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। প্রস্তাবিত এই বিলে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এই গানের গায়নে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করেন বা অসম্মান প্রদর্শন করেন, তবে তাঁকে তিন বছর পর্যন্ত জেলের মেয়াদ এবং সঙ্গে আর্থিক জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।
এই খবর সর্বসমক্ষে আসতেই গোটা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন ও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও উমর খালিদের বাবা সৈয়দ কাসিম রসুল ইলিয়াস এই প্রস্তাবিত বিলটিকে দেশের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘আইনি অত্যাচারের’ একটি গভীর ষড়যন্ত্র বলে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের (এআইএমপিএলবি) একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইলিয়াস তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্র সরকার ধারাবাহিকভাবে মুসলিমদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার চালিয়ে আসছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, একদিকে বুলডোজার নীতি প্রয়োগ করে তাঁদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর অন্যদিকে এখন ‘বন্দে মাতরম’ অবমাননা রোধের বিল এনে আইনি পথে মুসলিমদের কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, ইসলাম ধর্মে মুসলিমরা এক ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী, তাই দেশকে ‘মাতা’ রূপে বন্দনা করা বা পূজা করা তাঁদের মৌলিক ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এই বিলকে তিনি মুসলিমদের সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত আব্রু নিয়ে ছিনিমিনি খেলার একটি সুপরিকল্পিত অংশ বলে অভিহিত করেছেন।
এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পর থেকেই জাতীয় রাজনীতির ময়দানে তুমুল প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষস্থানীয় নেতারা পাল্টা জোরালো সওয়াল করে বলছেন যে, ‘বন্দে মাতরম’ হল ভারতের অখণ্ড জাতীয়তাবাদের এক পবিত্র প্রতীক। অমর সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস থেকে সংগৃহীত এই গান ১৯৫০ সালে দেশের অন্যতম জাতীয় সংগীত হিসেবে ঐতিহাসিক মর্যাদা লাভ করে। অন্য একটি জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’-এর অবমাননা রোধে যেমন কঠোর আইনি বিধি রয়েছে, ঠিক তেমনই ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্মান রক্ষা করাও দেশের প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র জাতীয় কর্তব্য ও সম্মানের প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মতে, এই নতুন বিল দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় প্রতীকের প্রতি অটুট শ্রদ্ধা নিশ্চিত করবে।
যারা জেনেশুনে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে এই মহান গানের অবমাননা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে, দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলি এই বিলকে সরাসরি স্বাধীন মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারের ওপর চরম হস্তক্ষেপ বলে তীব্র সমালোচনা করেছে। কংগ্রেসসহ সমমনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলির সাফ বক্তব্য, দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মতো জ্বলন্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলি বাদ দিয়ে কেন হঠাৎ করে সরকার এমন একটি মেরুকরণের বিল আনতে তৎপর হয়েছে?
উল্লেখ্য, বন্দে মাতরম নিয়ে এই ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বর্ণযুগে ব্রিটিশবিরোধী গণআন্দোলনে এই গানটি এক বিশাল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তবে অতীতে কিছু মুসলিম ধর্মীয় নেতা ‘মাতরম’ অর্থাৎ মাতৃরূপের বন্দনা শব্দটিকে বহু দেবতাবাদের ইঙ্গিত বলে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টও ইতিপূর্বে রায় দিয়ে জানিয়েছিল যে, এই গান গাওয়া বাধ্যতামূলক নয়, তবে এর অবমাননা বা অসম্মান করাও কোনোভাবেই উচিত নয়।
আসন্ন এই নতুন বিলটি সেই আইনি দিকগুলিকেই আরও বেশি স্পষ্ট করতে চাইছে। উমর খালিদের বাবা সৈয়দ কাসিম রসুল ইলিয়াস এআইএমপিএলবির সর্বভারতীয় মঞ্চকে ব্যবহার করে দেশজুড়ে এক ব্যাপক গণপ্রচারের ডাক দিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোডের মতো এই ‘বন্দে মাতরম’-এর বিধানও জোর করে মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর এই বিতর্কিত মন্তব্যকে গেরুয়া শিবির তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে একে সম্পূর্ণ ‘দেশবিরোধী’ মানসিকতা বলে অভিহিত করেছে। বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য মুখপাত্ররা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, দেশের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে কোনো রকম ধর্মীয় বা সামাজিক বাধা থাকতে পারে না, কারণ এই দেশমাতৃভূমি সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ও পূজনীয় হওয়া উচিত।