আকাশছোঁয়া সোনা পাচারের মহাজাল! ভারতজুড়ে ডিআরআই-এর জালে ১৫ কেজি সোনা ও ২০ কেজি রুপো

দেশজুড়ে চোরাচালানকৃত সোনার বিরুদ্ধে ক্রমাগত কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে প্রশাসন। সাম্প্রতিক সময়ে ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্সের (ডিআরআই) কর্মকর্তারা দেশজুড়ে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে মোট ১৫ কিলোগ্রাম চোরাচালানকৃত সোনা এবং ২০ কিলোগ্রাম রুপা জব্দ করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক ঘটনা নয়। সরকারি তথ্য থেকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় যে, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষ থেকে শুরু করে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত, শুল্ক বিভাগ এবং ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স শুধুমাত্র দেশের বিমানবন্দরগুলো থেকেই মোট ৮,৫৯৮.১৮ কিলোগ্রাম সোনা বাজোপ্ত করেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫,০০৩.৬০ কোটি টাকা। দেশে সোনা কেনা এবং কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সরকার আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি করেছে। তবে এর ফলেই উল্টো সোনা চোরাচালানের প্রবণতা আরও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। এর ফলে বর্তমানে সাধারণ মানুষের মনে একাধিক জটিল প্রশ্ন দানা বাঁধছে: এত পরিমাণ সোনা ভারতে কোথা থেকে আসছে, কোন কোন দেশ এর প্রধান উৎস, এবং ক্রমবর্ধমান সোনা আমদানি কি এর নেপথ্যের মূল কারণ? আসুন এই সোনালী চোরাচালানের পুরো যোগসূত্র ও নেটওয়ার্কটি বিস্তারিতভাবে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

সংসদে কেন্দ্রীয় সরকারের পেশ করা সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত বিমানবন্দরগুলিতে মোট ১৩,২১৩টি সোনা চোরাচালানের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ সালে চোরাচালান এবং সামগ্রিক জব্দের পরিমাণ সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। শুধুমাত্র ওই একটি অর্থবর্ষেই চার বছরে জব্দ হওয়া মোট সোনার প্রায় ৪৩ শতাংশ আটক করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়েও বিমানবন্দরগুলিতে লাগাতার কড়া তল্লাশি এবং জব্দের অভিযান অব্যাহত ছিল এবং ২০২৫ সালে এই পরিমাণ লাফিয়ে বেড়ে ৮,০০০ কিলোগ্রামেরও বেশি ছুঁয়ে ফেলে।

আসল প্রশ্ন হলো, এত বিপুল পরিমাণ সোনা ঠিক কোথা থেকে আসছে? অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতে পাচার হওয়া এই সোনার সিংহভাগই মূলত আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে, যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই সর্বাগ্রে রয়েছে। অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্য হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব কোনো সোনার খনি বা প্রাকৃতিক ভাণ্ডার নেই। তাদের পুরো সোনা অন্য দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ইউএই তার মোট সোনার সিংহভাগ বা প্রায় ৫৭ শতাংশই আমদানি করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে। মালি, সুদান এবং উগান্ডার মতো খনিজসমৃদ্ধ দেশগুলো এই আমদানির মূল উৎস। এছাড়া তুরস্ক এবং সুইজারল্যান্ড থেকেও কাঁচা সোনা আমদানি করে তা স্থানীয়ভাবে পরিশোধন করা হয়। এই পরিশোধিত ও তুলনামূলক সস্তা সোনা এরপর অত্যন্ত সুকৌশলে ভারতে পাচার করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা চ্যাথাম হাউসের “গোল্ড অ্যান্ড দ্য ওয়ার ইন সুদান” শীর্ষক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইউএই আফ্রিকা থেকে প্রায় ২,৫৬৯ টন সোনা আমদানি করেছে, যার বড় অংশই আফ্রিকার দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক রপ্তানি হিসাবে নথিভুক্ত করা হয়নি এবং যার আনুমানিক আর্থিক মূল্য প্রায় ১১৫.৩ বিলিয়ন ডলার।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ভারত কেন সরাসরি আফ্রিকা থেকে সোনা আমদানি করে না এবং কেন দুবাইকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করা হয়? এর মূল কারণ হলো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন এবং বিধিনিষেধ। FATF, OECD, এবং LBMA-এর মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর নিরাপদ সোনার বা কমপ্লায়েন্ট সোনার তালিকা থেকে বেশিরভাগ আফ্রিকান দেশকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তাদের কাছ থেকে সরাসরি সোনা কেনা আইনত অবৈধ। তবে, সংযুক্ত আরব আমিরাত অনানুষ্ঠানিকভাবে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা আমদানি করে, নিজেদের পরিশোধনাগারে তা রিফাইন করে এবং তারপর আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে। আর এই প্রক্রিয়ার অন্তরালেই বড়সড় চোরাচালান সংঘটিত হয়। বৈশ্বিক খ্যাতনামা এনজিও ‘ইমপ্যাক্ট’-এর একটি প্রতিবেদনেও এই বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। সেখানে ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম সোনা চোরাচালান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে মূলত ভারতীয় বংশোদ্ভূত একদল অসাধু ব্যবসায়ীর শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পূর্ব আফ্রিকার তানজানিয়া ও উগান্ডার মতো দেশ থেকে সোনা পাচার করা হয়।

সাম্প্রতিক ডিআরআই অভিযানে আরও বেশ কিছু অভিনব ও নতুন রুট উন্মোচিত হয়েছে। প্রথমত, ব্যাংকক-মুম্বই ট্রানজিট রুট: বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্স কর্মীদের অভ্যন্তরীণ সহযোগিতায় ব্যাংকক থেকে মুম্বই বিমানবন্দরে ট্রানজিটের সময় সোনা সরবরাহ করার সময় বাংলাদেশি ও শ্রীলঙ্কান বিমান সংস্থাগুলির একাধিক পাচারকারী ধরা পড়েছে। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরব রুট: মদিনা থেকে মুম্বইয়ে সরাসরি আসা সাধারণ যাত্রীরা বিশেষ মোমের আকারে সোনার গুঁড়ো শরীরের ভেতরে বা লাগেজে লুকিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তৃতীয়ত, মার্কিন রুট: বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের বিশ্বস্ত কর্মীদের প্রত্যক্ষ মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে সোনা পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্যও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে।

তাহলে এই ব্যাপক হারে সোনা চোরাচালান কেন সংঘটিত হচ্ছে? এর পেছনে একাধিক মূল কারণ কাজ করছে। প্রথমত, বিশাল মূল্য পার্থক্য: ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের তুলনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলিতে সোনার দাম অনেকটাই কম থাকে, আর এই মোটা লাভের অঙ্কই চোরাচালানকে প্রধান ইন্ধন জোগায়। দ্বিতীয়ত, আমদানি শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা: চড়া হারে শুল্ক এড়ানোর জন্য অসাধু চক্র নির্ধারিত আইনি সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি সোনা লুকিয়ে দেশে নিয়ে আসে। তৃতীয়ত, উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত সাধারণ ভারতীয় শ্রমিকদের ব্যবহার: দুবাই এবং উপসাগরীয় দেশগুলিতে কর্মরত বহু অভিবাসী শ্রমিক সামান্য কিছু টাকার লোভে বড় বড় চোরাচালান চক্রের পাতি ক্যারিয়ারে পরিণত হয় এবং লক্ষ লক্ষ টাকার সোনা নিজেদের লাগেজে বা শরীরে লুকিয়ে দেশে নিয়ে আসে। চতুর্থত, সুসংগঠিত অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক: শুধু সাধারণ যাত্রীরাই নয়, বরং বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড স্টাফ, হ্যান্ডলার এমনকি সোনা গলানোর গোপন সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আস্ত এক একটি সংগঠিত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। পঞ্চম এবং সবথেকে বিপজ্জনক বিষয় হলো অত্যন্ত অভিনব পদ্ধতি: সোনাকে বর্তমান সময়ে তরল পেস্ট, বিশেষ মোম বা সূক্ষ্ম গুঁড়োতে রূপান্তরিত করে, ক্যাপসুলে ভরে পেটে গিলে, কিংবা লাগেজের ধাতব ফ্রেম ও রডের ফাঁপা অংশের মধ্যে লুকিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত উপায়ে চোরাচালান করা হচ্ছে।