অবশেষে প্রকাশ্যে আসছে সেই বিতর্কিত রিপোর্ট! ২১ জুলাইয়ের ঘটনা নিয়ে বড় পদক্ষেপ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তারিখটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। সেই রক্তাক্ত ও উত্তাল দিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নানা জলঘোলা এবং বহু বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকার সুবাদে সেই মর্মান্তিক ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য গঠিত বিচার বিভাগীয় কমিশন বা সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট এতদিন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। বিরোধী দলগুলির দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে রাজনৈতিক স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত রিপোর্ট অত্যন্ত সুকৌশলে গোপন রাখা হয়েছে। আর ঠিক এই স্পর্শকাতর প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই এবার রাজ্যের রাজনীতিতে এক বিরাট বিস্ফোরণ ঘটাতে চলেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে দীর্ঘদিনের অবহেলিত ও ধামাচাপা পড়ে থাকা এই চাঞ্চল্যকর সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট খুব শীঘ্রই তিনি সকলের সামনে উন্মুক্ত করবেন।

রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনার পর রাজ্য সরকারের নির্দেশে প্রাক্তন বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠিত হয়েছিল। ওই কমিশন দীর্ঘ তদন্ত চালিয়ে ঘটনার সমস্ত দিক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখে এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, মূল্যবান নথি ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে একটি বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করে। এরপর নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে সেই গোপন রিপোর্ট সরকারের কাছে জমাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন ও বর্তমান রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পরেও সেই রিপোর্ট ফাইলবন্দিই থেকে যায় এবং কোনো সরকারই তা জনসমক্ষে আনার সাহস দেখায়নি। বছরের পর বছর ধরে এই রিপোর্ট গোপন রাখা নিয়ে বিরোধীরা একাধিকবার রাজ্য সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারীর এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনার ঘোষণা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে প্রবল চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। শুভেন্দু অধিকারীর কড়া দাবি, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে রাজ্যের প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনার সত্যতা জানার। এত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর একটি সরকারি তদন্ত রিপোর্ট দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে বা গোপনীয়তার আড়ালে লুকিয়ে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁর মতে, ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই মর্মান্তিক ঘটনাকে ঘিরে গত তিন দশক ধরে যে রাজনৈতিক তরজা, মিথ্যা প্রচার এবং মনগড়া তত্ত্ব খাড়া করা হয়েছে, এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে চলে এলে তার প্রকৃত সত্যতা সকলের সামনে উন্মোচিত হবে। কোন পরিস্থিতিতে সেদিন কী ঘটেছিল এবং এর নেপথ্যে আসল সত্যিটা কী ছিল, তা পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার ভয়েই এতদিন শাসক শিবির রিপোর্টটি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা।

তবে এই রিপোর্টে ঠিক কী ধরনের স্পর্শকাতর পর্যবেক্ষণ, তথ্য বা চাঞ্চল্যকর সুপারিশ রয়েছে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে আনা হয়নি। এই গোপনীয়তার কারণেই রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহলের পারদ হু হু করে চড়েছে। বিশেষ করে প্রতি বছর জুলাই মাস এলেই যে শাসক দল ২১ জুলাইকে কেন্দ্র করে বিশাল রাজনৈতিক কর্মসূচি ও শহিদ স্মরণের আয়োজন করে, তার ঠিক প্রাক্কালে শুভেন্দু অধিকারীর এই রিপোর্ট ফাঁসের উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। আসন্ন দিনে এই রিপোর্ট জনসমক্ষে এলে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ যে সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে এবং শাসক দল বড় ধরনের নৈতিক বিপাকে পড়তে পারে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে ঠিক কোন কৌশলে এবং কখন এই ঐতিহাসিক রিপোর্ট সর্বসমক্ষে তুলে ধরেন শুভেন্দু অধিকারী।