ভারতের নতুন ইতিহাস! দেশীয় প্রযুক্তিতে চালু হলো দেশের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন, বদলে যাবে রেল ভ্রমণ!

ভারতের পরিবহন ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল-চালিত ট্রেনের যাত্রার সূচনা করেছেন। এই সাফল্যের হাত ধরে ভারত এখন জার্মানি, জাপান, চিন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর সারিতে নাম লিখিয়ে পরিবেশবান্ধব রেল পরিবহনের জগতে এক নতুন যুগের সূচনা করল। উত্তর রেলের জিন্দ-সোনিপত রুটে চলা এই ট্রেনটি বর্তমানে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বা পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে চালু করা হয়েছে।

কীভাবে কাজ করে এই ট্রেন?
প্রচলিত ডিজেল লোকোমোটিভের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এই ট্রেন। এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে ১,২০০-কিলোওয়াট ক্ষমতার ‘প্রোটন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন ফুয়েল সেল’ (PEMFC)। ট্রেনটি হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ নিজেই উৎপাদন করে। এই প্রক্রিয়ার একমাত্র উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট হলো কেবল জলীয় বাষ্প এবং তাপ, যার ফলে এটি বিশ্বের অন্যতম দূষণমুক্ত প্রযুক্তি। ট্রেনের পাওয়ার কারগুলোতে রাখা উচ্চ-চাপের সিলিন্ডারে থাকা হাইড্রোজেন গ্যাস ফুয়েল সেলে সরবরাহ করা হয়। সেখানে প্ল্যাটিনাম অনুঘটকের সাহায্যে হাইড্রোজেন অণুকে প্রোটন ও ইলেকট্রনে বিভক্ত করে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়, যা ট্রেনের মোটরকে সচল রাখে। অতিরিক্ত শক্তি জমার জন্য এতে ‘লিথিয়াম আয়রন ফসফেট’ (LFP) ব্যাটারিও যুক্ত করা হয়েছে।

খরচ কম, কার্যক্ষমতা বেশি
ডিজেলের তুলনায় হাইড্রোজেনের শক্তি ঘনত্ব অনেক বেশি। যেখানে ডিজেলের শক্তি ঘনত্ব ৪৩ মেগাজুল/কেজি, সেখানে হাইড্রোজেনের ঘনত্ব প্রায় ১২০ মেগাজুল/কেজি। কোনো কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই এটি উচ্চ কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করে। এই প্রযুক্তির ফলে ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলা অনেক কমে যায় এবং পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবও থাকে না বললেই চলে।

সুরক্ষা ও পরিকাঠামো
এই ট্রেন পরিষেবার জন্য হরিয়ানার জিন্দে ভারতের বৃহত্তম রেলওয়ে হাইড্রোজেন সংরক্ষণ ও রিফুয়েলিং কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এই কেন্দ্রটি ৩,০০০ কিলোগ্রাম হাইড্রোজেন সংরক্ষণ করতে সক্ষম এবং এটি ‘পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস সেফটি অর্গানাইজেশন’ (PESO) দ্বারা অনুমোদিত। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে এটি জার্মানির ‘TUV SUD’ দ্বারা পরীক্ষিত। ১০টি কোচ বিশিষ্ট এই ট্রেনটি সর্বোচ্চ ১১০ কিমি গতিতে ছুটতে সক্ষম হলেও বর্তমানে ৭৫ কিমি গতিতে চালানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রায় ২,৬০০ যাত্রী পরিবহণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই ট্রেনে হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর, স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ ব্যবস্থা এবং অগ্নিনির্বাপক প্রযুক্তির মতো অত্যাধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।

‘আত্মনির্ভর ভারত’ এবং ‘জাতীয় গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন’-এর অংশ হিসেবে এই প্রকল্পটি ভারতীয় রেলকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাইড্রোজেন-চালিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পরিচালনগত অভিজ্ঞতা প্রদান করবে। এটি কেবল একটি ট্রেনের সূচনা নয়, বরং একটি টেকসই ভবিষ্যতের দিকে ভারতের বড় পদক্ষেপ।