গগনযান অভিযানের মুখে বড় ধাক্কা! ইসরো ছেড়ে স্টার্টআপে যোগ দিচ্ছেন শতাধিক বিজ্ঞানী

একদিকে যখন গগনযান অভিযানের মাধ্যমে মহাকাশে প্রথমবার ভারতীয় নভোচর পাঠানোর ঐতিহাসিক প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ইসরো, ঠিক সেই সময়েই সংস্থার অন্দরে দানা বেঁধেছে এক গভীর সংকট। গত কয়েক মাসে ইসরো ছেড়েছেন শতাধিক বিজ্ঞানী ও কারিগরি কর্মী। সরকারি মহাকাশ গবেষণাগার থেকে এই ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচারের ঘটনায় রীতিমতো উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীয় মহাকাশ বিভাগে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গণইস্তফার পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে দেশের ক্রমবর্ধমান বেসরকারি স্পেস স্টার্টআপ সংস্কৃতি। ২০২০ সালে মহাকাশ খাত বেসরকারি উদ্যোগের জন্য খুলে দেওয়ার পর ভারতে ৪০০-এরও বেশি নতুন স্টার্টআপ গড়ে উঠেছে। স্কাইরুট অ্যারোস্পেস, অগ্নিকুল কসমস বা বেলাট্রিক্স অ্যারোস্পেসের মতো সংস্থাগুলো বিদেশি বিনিয়োগের জোরে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের দিচ্ছে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ এবং আকাশছোঁয়া পদ। এমনকি ইসরোর অনেক প্রাক্তন কর্মকর্তা এখন এই সংস্থাগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন।
বেতন কাঠামো এই দলবদলের সবথেকে বড় কারণ। সরকারি বেতন কাঠামোর সীমাবদ্ধতা বেসরকারি প্রতিযোগিতার সামনে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। একজন এন্ট্রি-লেভেল বিজ্ঞানী ইসরোতে মাসিক প্রায় ৭২ হাজার টাকা বেতন পান, যেখানে অভিজ্ঞ সিনিয়র বিজ্ঞানীদের সর্বোচ্চ মাসিক বেতন ২ লাখ টাকার আশেপাশে। বিপরীতে, বেসরকারি স্টার্টআপগুলো ইসরোর অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের বছরে ৫০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি টাকা পর্যন্ত প্যাকেজ অফার করছে। শুধু মোটা অঙ্কের বেতনই নয়, শেয়ার বা ইক্যুইটির লোভনীয় হাতছানিও বিজ্ঞানীদের সরকারি চাকরি ছাড়তে প্রলুব্ধ করছে, যা ইসরোর সরকারি নীতিতে একেবারেই অসম্ভব।
কাজের পরিবেশ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও বিজ্ঞানীদের একাংশকে হতাশ করছে। গগনযান, এসএসএলভি বা জিএসএলভি-র মতো হাই-প্রোফাইল মিশনগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধীর গতি এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রমুখিতা বিজ্ঞানীদের কাজের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে বলে মনে করছেন অনেকে। ফলে সৃজনশীল গবেষণার বদলে রুটিন কাজে বিরক্ত হয়ে তারা পা বাড়াচ্ছেন বেসরকারি ক্ষেত্রের দিকে।
এই প্রবণতা রুখতে গত ১৪ জুলাই কেন্দ্রীয় মহাকাশ বিভাগ একটি কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে। এখন থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যুক্ত ‘গ্রুপ এ’ স্তরের বিজ্ঞানীদের ইস্তফা বা স্বেচ্ছাবসরের ক্ষমতা ইসরোর স্থানীয় ডিরেক্টরদের হাত থেকে সরিয়ে সরাসরি কেন্দ্রীয় মহাকাশ বিভাগের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ইস্তফার আবেদন আর সাধারণ রুটিন প্রশাসনিক কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে না। তবে প্রশাসনিক কড়াকড়ি কি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে পারবে? শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরোর বেতন কাঠামো সংস্কার এবং কাজের পরিবেশে আধুনিকায়ন ছাড়া এই মেধা পাচার পুরোপুরি রোধ করা কঠিন। ভারতের মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য এখন ইসরোর অভ্যন্তরেই আমূল নীতিগত পরিবর্তনের দাবি উঠছে।