লন্ডনে রাজনৈতিক পালাবদল হলেও কি অটুট থাকবে ভারত-ব্রিটেন সম্পর্ক? মুখ খুললেন ব্রিটিশ ট্রেড কমিশনার!

ব্রিটেন এবং ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিটি দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বন্ধনে অত্যন্ত মজবুত। লন্ডনের রাজনীতিতে পালাবদল ঘটলেও ভারত-ব্রিটেনের সম্পর্কের উষ্ণতায় ভাটা পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। এই আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে ব্রিটেনের দক্ষিণ এশিয়ার ট্রেড কমিশনার হরজিন্দর কাং-এর আশাবাদী বক্তব্য। তিনি ভারত-ব্রিটেন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নাম উঠে আসছে। লেবার পার্টির বিপুল সংখ্যক সাংসদের সমর্থনপুষ্ট বার্নহ্যামের নেতৃত্ব নিয়েও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন কাং। তিনি জানিয়েছেন, বার্নহ্যামের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত আলোচনার অভিজ্ঞতায় এটি স্পষ্ট যে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে তিনি অত্যন্ত আগ্রহী। এমনকি গ্রেটার ম্যানচেস্টার ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক মিশন তৈরি করতে বার্নহ্যাম নিজে থেকেই উদ্যোগী ছিলেন। কাং-এর মতে, ব্রিটেনের কোনো রাজনৈতিক দলই বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিন্ন করার মতো ভুল করবে না।
ভারতের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক কেন অনন্য, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কাং জানান, আমেরিকা, জার্মানি বা ফ্রান্সের তুলনায় আমাদের মিল অনেক বেশি। খেলাধুলা, ভাষা, আইনি ব্যবস্থা এবং প্রবাসীদের উপস্থিতির কারণে ভারত-ব্রিটেন সম্পর্ক একটি ভিন্ন মাত্রা পায়। তিনি বলেন, এই সম্পর্ককে উপেক্ষা করা ব্রিটেনের জন্য বোকামি হবে। বিশ্ব রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার চাপের মুখেও এই দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনার স্বাভাবিক গতি কখনো বাধাগ্রস্ত হয়নি।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণাত্মক বাণিজ্য শুল্কের ফলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও, ভারত ও ব্রিটেনের ক্ষেত্রে তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং দুই দেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক নেতৃত্ব পরিপক্ক আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এর প্রমাণ হিসেবে কাং একটি মজার ঘটনা উল্লেখ করেছেন—ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং ব্রিটিশ বাণিজ্য সচিব জনাথন রেনল্ডস লন্ডনের এক পার্কে হাঁটতে হাঁটতে আইসক্রিম খেতে খেতেই এই ঐতিহাসিক চুক্তির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছিলেন।
এই দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক মাইলফলক হিসেবে ১৫ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে ‘কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (CETA)। গত বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লন্ডন সফরের সময় স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এই চুক্তির আওতায় আগামী বছরগুলোতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বছরে ২৫.৫ বিলিয়ন পাউন্ড বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ভারতের ৯০.২ শতাংশ পণ্য ব্রিটেনে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পাবে, যা টেক্সটাইল, হুইস্কি এবং গাড়ির মতো ক্ষেত্রগুলোতে ভারতীয় রপ্তানিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। সামগ্রিকভাবে, ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া ভারত-ব্রিটেন সম্পর্কের মজবুত ভিতকে কোনোভাবেই নড়বড়ে করতে পারবে না বলেই নিশ্চিত করেছেন কূটনীতিকরা।