‘কলকাতা আমার দ্বিতীয় বাড়ি’! সব বাধা পেরিয়ে ফের শহরের মাটিতে তসলিমা, মুক্তচিন্তার ঐতিহাসিক জয়?

দীর্ঘ ১৯ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে অবশেষে কলকাতার মাটিতে পা রাখতে চলেছেন বিশ্বখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ অগাস্ট কলকাতার প্রাণকেন্দ্র রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তাঁর যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। ‘সেক্যুলার মিশন’ ও ‘এইচআরবিএফএফ’-এর আমন্ত্রণে আয়োজিত এই সভায় তিনি মুক্তচিন্তা ও মৌলবাদবিরোধী সচেতনতার ডাক দেবেন। নির্বাসিত এই লেখিকার বাংলায় ফেরার খবরে দুই বাংলার সাহিত্যপ্রেমী ও মুক্তমনা মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
তসলিমা নাসরিনের কলকাতা ত্যাগের ইতিহাস এক চরম নাটকীয়তায় ভরা। ২০০৩ সালে তাঁর বিতর্কিত আত্মজীবনী ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশের পর রাজ্যে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার রাস্তায় তসলিমার বিরুদ্ধে কট্টরপন্থী সংগঠনগুলোর হিংসাত্মক প্রতিবাদ পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। নিরাপত্তার অজুহাতে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার কার্যত রাতারাতি তাঁকে কলকাতা থেকে সরিয়ে জয়পুর ও পরে দিল্লিতে পাঠিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ সময় তিনি ভারতের বাইরে কিংবা দিল্লির কড়া নিরাপত্তাবলয়ে জীবন কাটিয়েছেন। তবে বারবার তাঁর লেখায় উঠে এসেছে কলকাতার অলিতে-গলিতে ফিরে আসার আকুলতা।
তিনি বরাবরই দাবি করে এসেছেন যে, বাংলা ভাষাভাষী এই শহরই তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। দীর্ঘ এই কঠিন যাত্রাপথেও তাঁর ধারালো কলম কখনও থমকে যায়নি। নারী অধিকার, কুসংস্কার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার থেকেছেন। এবার আয়োজকদের মতে, তসলিমা নাসরিন কেবল একজন লেখিকা নন, তিনি ‘মৌলবাদ বিরোধী প্রতিবাদের অগ্নিসম প্রতীক’। তাঁর এই আগমন মুক্ত চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতার লড়াইয়ে এক বড় মাইলফলক বলে মনে করছেন তাঁর অনুরাগীরা।
তবে এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একাংশের মতে, একজন মুক্তমনা লেখকের নিজের মাতৃভাষার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ফিরে আসার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে অন্য একটি অংশ নতুন কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরির আশঙ্কা করছেন। রবীন্দ্রসদনের এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। উদ্যোক্তারা আশাবাদী, এই অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হবে এবং বাংলার মানুষ তাদের সংস্কৃতিপ্রেমের অনন্য পরিচয় দেবেন। সবমিলিয়ে, ১ অগাস্টের এই অনুষ্ঠান কেবল একজন লেখকের শহরে ফেরা নয়, বরং বাক-স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে।