৭ বছরের কারাদণ্ড ভুলে মুক্তি! সৎ বাবার বিরুদ্ধে ওঠা ধর্ষণের মামলায় চাঞ্চল্যকর রায় হাইকোর্টের

সাত বছর আগেকার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। পকসো আইনে দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেল খাটছিলেন সৎ বাবা। কিন্তু দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে পুরো মোড় ঘুরে গেল ঘটনার। যাবতীয় অভিযোগ থেকে ওই ব্যক্তিকে বেকসুর খালাস করল উচ্চ আদালত। বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের এই রায় এখন রাজ্যজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮ সালে। ১৬ বছরের এক কিশোরী হঠাৎ পেটে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে কলকাতার একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়। চিকিৎসকদের পরীক্ষায় জানা যায়, সে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই খবর সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসে পরিবার। জ্ঞান ফেরার পর কিশোরী দাবি করে, তার সৎ বাবা দীর্ঘদিন ধরে তাকে যৌন নির্যাতন করেছে এবং কাউকে কিছু না বলার জন্য প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছে। এরপরই কিশোরীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে টালা থানায় পকসো আইনের ৪ ও ৬ নম্বর ধারায় মামলা রুজু হয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিম্ন আদালত অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ট্রায়ালের সময় কিশোরী নিজে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এবং আদালতে দাঁড়িয়ে অভিযুক্তকে শনাক্ত করেছিল। ১১ জন সাক্ষীর বয়ানও রেকর্ড করা হয়েছিল।
কিন্তু নিম্ন আদালতের সেই রায় চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আপিল করেন অভিযুক্ত। সাত বছর ধরে চলা দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা ও বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চ অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করার নির্দেশ দেয়। হাইকোর্ট রায়ের স্বপক্ষে বেশ কিছু জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছে। প্রথমত, অভিযোগের দেরি। আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে, কিশোরী দীর্ঘদিন বিষয়টি চেপে গিয়েছিল এবং কেবল অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পরই অভিযোগ ওঠে।
দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব। ডিভিশন বেঞ্চ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে যে, অভিযুক্তকে গর্ভধারণের সঙ্গে যুক্ত করার মতো কোনো ডিএনএ টেস্ট বা ফরেনসিক রিপোর্ট পুলিশের তদন্তে পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকদের রিপোর্টে কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কথা থাকলেও, তা রোগীর বয়ানের ওপর ভিত্তি করেই লেখা হয়েছিল। আদালতে যৌন সম্পর্কের প্রমাণ মিললেও, সেই সম্পর্কের সঙ্গে অভিযুক্তের সম্পৃক্ততা প্রমাণের মতো কোনো ফরেনসিক তথ্য ছিল না। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ‘সন্দেহ কখনও প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।’ এই তদন্তের ঘাটতিই অভিযুক্তের মুক্তির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াল। আইনি মহলের মতে, এই রায় আবারও মনে করিয়ে দিল যে, অপরাধের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ফরেন্সিক রিপোর্ট কতখানি গুরুত্বপূর্ণ।