নেতাজির দলকে ‘গুণ্ডা’ আখ্যা শমীক ভট্টাচার্যের! ফরওয়ার্ড ব্লকের মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নজিরবিহীন তর্কের জন্ম দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ দলকে ‘গুণ্ডা’ বলে সম্বোধন করে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তা মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে এবং তীব্র নিন্দার মুখে পড়েছেন তিনি।

গত ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শমীক ভট্টাচার্য অভিযোগ করেন যে, মুহাম্মদ আলি পার্কে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সভায় ফরওয়ার্ড ব্লকের কর্মীরা পাথর ছুঁড়েছিলেন এবং তাঁর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন। শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, “শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, তিনি চাইলে তৎক্ষণাৎ প্রতিশোধ নেওয়া যেত, কিন্তু তিনি তা না করে গণতান্ত্রিক পথে ব্যালটের মাধ্যমে উত্তর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।”

এই মন্তব্যের পরেই সরব হয়েছে ফরওয়ার্ড ব্লক। দলের সাধারণ সম্পাদক জি দেবরাজন এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “নেতাজি ও তাঁর অনুগামীদের গুণ্ডা বলাটা কেবল অসম্মানজনকই নয়, এটি ইতিহাসের বিকৃতি। নেতাজির আদর্শে অনুপ্রাণিত কর্মীরা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন বলেই আজকের বিজেপি এমন কুরুচিকর মন্তব্য করছে।” বামপন্থী দলগুলোও এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, নেতাজিকে অপমান করার লক্ষ্যেই বিজেপি ধারাবাহিকভাবে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে ‘বাঙালি আইকন’ হিসেবে বড় করে দেখাতে চাইছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সঙ্ঘ পরিবার দীর্ঘ সময় ধরেই সুভাষচন্দ্র বসুর প্রভাবকে ছোট করে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ভাবমূর্তিকে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই বিতর্কের মাঝেই উঠে আসছে অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ। ১৯১৯ সালের আইন ও পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইন অনুযায়ী বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভা যেভাবে ধর্মের ভিত্তিতে আসন বণ্টন করেছিল, তা আজও বাংলার ইতিহাসে এক দীর্ঘমেয়াদী বিভাজনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৩৭ সালের ৭ এপ্রিল দুই কক্ষ বিশিষ্ট প্রাদেশিক আইনসভার প্রথম অধিবেশন বসেছিল, যেখানে তপশিলি জাতি, মুসলমান, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সহ বিভিন্ন পেশার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, ধর্মের ভিত্তিতে ওই বিভাজনই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বীজ রোপণ করেছিল। আর সেই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ফরওয়ার্ড ব্লকের মতো নেতাজি-প্রতিষ্ঠিত দলকে আক্রমণ করাটা বঙ্গীয় রাজনীতির মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তুলেছে। শমীক ভট্টাচার্যের এই মন্তব্য কি শুধুই নির্বাচনী কৌশলের অংশ, নাকি ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যার এক পরিকল্পিত অপচেষ্টা—তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।