১৪ বছর পার, তবু মেলেনি সুবিচার! শুভেন্দুর ‘জনতার দরবার’-এ এসে বিচারের আশায় কান্নায় ভাঙলেন বরুণ বিশ্বাসের পরিবার

দীর্ঘ ১৪টি বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে উত্তর ২৪ পরগনার সুটিয়ার প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের হত্যাকাণ্ডের মামলা। বিচারপ্রার্থী অসহায় পরিবারের দীর্ঘশ্বাস আজও থামেনি। ঠিক সেই আবহে, নতুন আশার আলো নিয়ে সল্টলেকের রাজ্য বিজেপি সদর দফতরে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ‘জনতার দরবার’-এ হাজির হলেন নিহত বরুণ বিশ্বাসের পরিবারের সদস্যরা। আগামীকাল ৫ জুলাই, রবিবার এই প্রতিবাদী শিক্ষকের মৃত্যুবার্ষিকী। প্রিয়জনকে হারানোর দেড় দশকের কাছাকাছি সময়েও যখন ন্যায়বিচার অধরা, তখন শেষ ভরসা হিসেবেই তারা দ্বারস্থ হলেন শুভেন্দু অধিকারীর।

২০১২ সালের ৫ জুলাইয়ের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাজা এলাকাবাসীর মনে। গোবরডাঙা স্টেশন চত্বরে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে খুন করা হয়েছিল কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসকে। সুটিয়ার অপরাধ জগতের বিরুদ্ধে একাই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তাঁর সেই প্রতিবাদী সত্তাই হয়তো কাল হয়েছিল তাঁর জীবনে। খুনের ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ মোট ৯ জনকে গ্রেফতার করেছিল। কিন্তু মামলা গড়িয়েছে বছরের পর বছর। দীর্ঘ এই আইনি লড়াইয়ের প্রক্রিয়ায় বহুবার সরকারি আইনজীবী পরিবর্তন হয়েছে, যা মামলার গতিপ্রকৃতিকে বারবার শ্লথ করে দিয়েছে। ধৃতদের মধ্যে একজনের জেল হেফাজতেই মৃত্যু হয়েছে এবং বাকিরা বর্তমানে জামিনে মুক্ত। এক যুগের বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও খুনের কিনারা না হওয়ায় এবং অপরাধীরা শাস্তির আওতায় না আসায় আদালতের প্রতি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

শুক্রবার সল্টলেকে বিজেপির রাজ্য সদর দফতরে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। নিত্যনতুন অভিযোগ নিয়ে মানুষ ভিড় জমিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারীর জনতার দরবারে। কিন্তু ভিড়ের মাঝেও বরুণ বিশ্বাসের পরিবারের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্য সরকার ও প্রশাসনের উদাসীনতার অভিযোগ তুলে তারা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অভিযুক্তরা যেভাবে বছরের পর বছর জামিনে মুক্ত থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

বিরোধী দলনেতার কাছে পরিবারের সদস্যরা তাদের দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন। তারা জানিয়েছেন, বারবার আইনজীবী বদল এবং মামলার শুনানিতে দীর্ঘসূত্রতা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ঘটনার ১৪ বছর হতে চললেও দোষীরা কেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেল না, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী তাদের অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজনীয় আইনি ও রাজনৈতিক সহায়তার আশ্বাস দেন। রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে তিনি জানান, একজন প্রতিবাদী শিক্ষকের হত্যাকারীরা কেন এখনো মুক্ত থাকবে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বরুণ বিশ্বাসের মৃত্যুবার্ষিকীর প্রাক্কালে পরিবারের এই আকুতি শুধু একটি পরিবারের লড়াই নয়, বরং রাজ্যে আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার এক জীবন্ত দর্পণ। শুভেন্দুর দরবার থেকে তারা এখন তাকিয়ে আছেন ভবিষ্যতের দিকে—আইন কি শেষ পর্যন্ত হত্যাকারীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে? নাকি আরও ১৪ বছর পেরোবে নিস্তব্ধতায়? উত্তর দেবে সময়, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ঘটনা আবারও রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে।