৫০ বছর পর ইতিহাসের পাতায় নতুনের চমক! এনসিইআরটি-র নবম শ্রেণির বইয়ে এবার ইন্দিরা গান্ধির জরুরি অবস্থা

ভারতের ইতিহাসের এক বিতর্কিত ও ঘটনাবহুল অধ্যায়—১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা। দীর্ঘ ৫০ বছর পর, সেই সময়কার ঘটনাবলি এখন ঠাঁই পেল নবম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে। এনসিইআরটি (NCERT) প্রথমবারের মতো তাদের নতুন সামাজিক বিজ্ঞানের বই ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড’-এ জরুরি অবস্থাকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছে। এতদিন এই বিষয়টি স্কুলের পাঠ্যক্রমের সরাসরি অংশ না থাকলেও, এবার তা ভারতীয় গণতন্ত্রের শক্তি ও প্রতিকূলতা আলোচনার মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে।

বইয়ের পাতায় জরুরি অবস্থার ভয়াবহতা:
নতুন পাঠ্যপুস্তকে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত জরুরি অবস্থা ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সামনে ছিল এক ভয়াবহ পরীক্ষার সময়। সত্তরের দশকে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের জেরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এই বইয়ে বিশ্লেষিত হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধি সরকারের সেই সিদ্ধান্তের ফলে অধিকাংশ মৌলিক অধিকার যে খর্ব হয়েছিল, সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছিল এবং হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে যে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তৎকালীন সময়ের প্রচণ্ড চাপ এবং নাগরিকদের স্বাধীনতার সংকোচন—এই বিষয়গুলো এখন শিক্ষার্থীরা সরাসরি পাঠ্যপুস্তকেই পড়ার সুযোগ পাবে।

জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্ব ও গণতন্ত্রের জয়:
পাঠ্যপুস্তকটিতে শুধুমাত্র জরুরি অবস্থার অন্ধকার দিকই নয়, বরং তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের কথাও সমান গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ‘লোকনায়ক’ জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে বিহার ও গুজরাতের শিক্ষার্থী ও নাগরিকরা যেভাবে সংগঠিত হয়েছিলেন, তা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই হিসেবে দেখানো হয়েছে। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার এবং সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন সরকারের পরাজয়ের ঘটনাটিকে ভারতীয় গণতন্ত্রের অমোঘ শক্তি ও জনগণের রায়ের গুরুত্ব হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ ও নাগরিক সচেতনতা:
কেবল জরুরি অবস্থাই নয়, পাঠ্যপুস্তকটিতে আধুনিক ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সামনে থাকা নানাবিধ চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভুয়া খবর (fake news), ভুল তথ্য (misinformation), সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, সামাজিক ও লিঙ্গ বৈষম্য এবং আঞ্চলিকতাবাদের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো। বইটিতে ‘গণতন্ত্র ও আপনি’ (Democracy and You) শিরোনামে একটি নতুন অংশ যুক্ত করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, শিক্ষার্থীরা যেন কেবল বই পড়ে জ্ঞান অর্জন না করে, বরং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকা বুঝতে পারে। এছাড়া, গণমাধ্যমকে ‘গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে উল্লেখ করে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এর ভূমিকা ও দায়বদ্ধতার বিষয়টিও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এনসিইআরটি-র এই নতুন উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত ইতিহাস ও দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সুপণ্ডিত ও সচেতন করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।