পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আবারও কঠোর অবস্থানে কলকাতা হাইকোর্ট। এবার গ্রেফতার করা অভিযুক্তদের কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানোর পুলিশি সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল উচ্চ আদালত। বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত ও বিচারপতি স্মিতা দাস দের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তের সম্মানহানি কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। এই নিয়ে রাজ্যের কাছে তিন সপ্তাহের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছে আদালত।
আইনজীবীদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আদালতের কথায়, “পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারে, আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ করতে পারে, এমনকি দোষ প্রমাণিত হলে আইনি সাজাও নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু গ্রেফতারের নামে পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো অভিযুক্তের সম্মানহানি করতে পারে না।” মানবাধিকার কর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, তদন্তের নামে পুলিশি বাড়াবাড়ি অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ সেই বিতর্ককেই নতুন মাত্রা দিল।
হাইকোর্টে শুনানি চলাকালীন রাজ্যের আইনজীবীর পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, ‘ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন’ বা অপরাধের পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্তদের বিভিন্ন ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে তোলাবাজির মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ থাকায় তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন জায়গায় তাদের নিয়ে যাওয়া পুলিশের আবশ্যিক রুটিনের অংশ। কিন্তু আদালত এই যুক্তি পুরোপুরি মেনে নেয়নি। ডিভিশন বেঞ্চের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ঠিক কী বিশেষ পরিস্থিতিতে অভিযুক্তদের কোমরে দড়ি পরানো প্রয়োজন হয়ে পড়ল? কেন তাদের সম্মান রক্ষার বিষয়টি পুলিশ বিবেচনায় রাখল না?
কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশে রাজ্য সরকারকে কঠোরভাবে সতর্ক করতে বলা হয়েছে। আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যকে হলফনামা জমা দিয়ে জানাতে হবে, পুলিশ ঠিক কী নীতি অনুসরণ করে অভিযুক্তদের রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছে এবং কেন দড়ি পরানোর মতো পদক্ষেপ করা হলো। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনকে আরও বেশি সংবেদনশীল এবং আইনি সীমার মধ্যে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জনস্বার্থ মামলাটির ফলাফল রাজ্যের পুলিশি তদন্তের ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক স্পর্শকাতর মামলায় পুলিশ অভিযুক্তদের দড়ি পরিয়ে বা হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাস্তায় হাঁটিয়েছে, যা নিয়ে বহুবার মানবাধিকার কমিশন সরব হয়েছে। হাইকোর্টের আজকের এই পর্যবেক্ষণ পুলিশি আচরণের ক্ষেত্রে একটি আইনি নজির তৈরি করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আগামী তিন সপ্তাহে রাজ্য সরকার আদালতে কী রিপোর্ট পেশ করে এবং পুলিশি কর্তারা তাদের কার্যপদ্ধতিতে কোনো সংশোধন আনেন কি না। এই নির্দেশ সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা আরও বাড়াবে বলে আশা করছেন বিশিষ্টজনেরা।





