১৫০ কোটি টাকার রাজকীয় বিয়ে থেকে কোটি কোটি টাকার সোনা—কে এই বীরভূমের টুলু মণ্ডল?

এই মুহূর্তে বাংলার রাজনীতি ও অপরাধ জগতের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটাই নাম— টুলু মণ্ডল (Tulu Mondal)। অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ এই পাথর ব্যবসায়ীকে ঘিরে কোটি কোটি টাকার নগদ অর্থ এবং বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধারের ঘটনায় বর্তমানে তোলপাড় রাজ্য। পুলিশি তদন্তে তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ কেজি সোনা এবং বস্তাবন্দি বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধারের পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, ঠিক কতটা প্রভাবশালী হলে এমন সম্পদের পাহাড় গড়া সম্ভব? এর মাঝেই প্রকাশ্যে এসেছে তাঁর মেয়ের বিয়েতে ১৫০ কোটি টাকা উড়ানোর চাঞ্চল্যকর তথ্যও।

১৫০ কোটির রাজকীয় বিয়ে ও তারকা সমাগম

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে টুলু মণ্ডলের মেয়ের বিয়েতে খরচ হয়েছিল মোটের ওপর প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা। বীরভূমের সিউড়িতে বসা সেই বিয়ের আসর দেখে চোখ কপালে উঠেছিল সাধারণ মানুষের। শুধু জমকালো আয়োজনই নয়, সেই আসর মাতিয়েছিলেন বলিউড ও টলিউডের একঝাঁক হেভিওয়েট তারকা। অতিথির তালিকায় ছিলেন অঙ্কুশ হাজরা, দর্শনা বণিক, আরবাজ খান, জারিন খান ও আফতাব শিবদাসানির মতো অভিনেতারা। স্বাভাবিকভাবেই, এই বিলাসবহুল আয়োজন এখন তদন্তকারীদের আতসকাচের নিচে রয়েছে।

মিনারের স্ত্রীর বিস্ফোরক দাবি

তদন্তে নেমে বীরভূমে টুলুর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে প্রায় সাড়ে ২৮ কোটি টাকা ও ১৫ কেজি সোনা উদ্ধার করে পুলিশ, যার জেরে মিনারকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনার পরেই মিনারের স্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, “এই টাকা আমাদের নয়। টুলু মণ্ডল নিজে এসে এই ব্যাগ রেখে গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে এর মধ্যে দরকারি কাগজপত্র আছে।” যদিও কোটি কোটি টাকা উদ্ধারের পর থেকেই মূল অভিযুক্ত টুলু মণ্ডল বর্তমানে বেপাত্তা।

দিনমজুর থেকে ‘পাথরসম্রাট’ হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প

বীরভূমের মহম্মদবাজার ব্লক এবং পাঁচামি সংলগ্ন এলাকা পূর্ব ভারতের অন্যতম বৃহৎ ব্যাসল্ট পাথর উৎপাদন কেন্দ্র। এখানকার উৎপাদিত স্টোনচিপ পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা এবং বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়। এই রমরমা ব্যবসার সঙ্গে নাম জড়িয়েছে বহু প্রভাবশালীর, যার মধ্যে অন্যতম প্রধান নাম টুলু মণ্ডল।

তবে শুরুর দিনগুলি এমন ছিল না। অতীতে পাথর খাদান এলাকায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন টুলু। সেখান থেকে ধীরে ধীরে পরিবহণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঠিকাদারি শুরু করেন। নিজের টাকায় লরি কিনে এবং পাথর পরিবহণের হাত ধরে তিনি প্রবেশ করেন এই কোটি টাকার রাজকীয় ব্যবসায়।

রাজনৈতিক যোগ ও অপরাধের ইতিহাস

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু পাথর শিল্পে নয়, রাজনৈতিক মহলেও নিজের প্রভাব বিস্তার করেন টুলু মণ্ডল। বিভিন্ন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নজরেও বারবার এসেছে তাঁর নাম। এর আগে ২০২২ সালে একটি খুনের মামলায় বীরভূম পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছিল। এমনকী আলোচিত গোরুপাচার মামলাতেও তাঁকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। দিনমজুর থেকে শুরু করে বর্তমানের এই বেপরোয়া সাম্রাজ্য বিস্তার—সব মিলিয়ে টুলু মণ্ডলের উত্থান ও পতনের কাহিনী এখন রাজ্যবাসীর মুখে মুখে।