উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার স্বরূপনগরের হাকিমপুর সীমান্ত এখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী। রাজ্যের নতুন সরকারের কড়া প্রশাসনিক অবস্থানের পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় নজিরবিহীন তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া বার্তার পর থেকেই সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের দেশে ফিরে যাওয়ার এক অবিরাম ঢল দেখা দিয়েছে। একদিকে যেমন বিএসএফ ও রাজ্য পুলিশ সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে তল্লাশি চালাচ্ছে, অন্যদিকে আইনি জটিলতা ও ধরপাকড় এড়াতে বহু অনুপ্রবেশকারী স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার পথ বেছে নিচ্ছেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই হাকিমপুর সীমান্তে ধরা পড়ল এক অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি। সম্প্রতি সীমান্ত পার হয়ে ধরা পড়া এক বাংলাদেশি মহিলা নিজের মুখেই তুলে ধরলেন এক অন্ধকার জগতের চালচিত্র। ওই মহিলার ভাষ্যমতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় এক ভারতীয় যুবকের। সেই ভার্চুয়াল আলাপ ধীরে ধীরে প্রণয়ে রূপ নিলে সে প্রেমের টানে এবং উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু এই যাত্রা যে কতটা বিপজ্জনক ও অনৈতিক, তা ওই মহিলার মুখেই স্পষ্ট। তিনি জানান, সীমান্ত পার হওয়ার জন্য তাকে কয়েক হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল দালালদের। সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বা স্থানীয় দালাল চক্রের নজর এড়িয়ে রাতের অন্ধকারে কীভাবে তিনি আন্তর্জাতিক কাঁটাতার পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন, তা শুনলে গা শিউরে ওঠে। এরপর এখানে এসে এক মন্দিরে গিয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করার কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন।
বর্তমানে এই ধরণের অসংখ্য ঘটনা প্রশাসনের নজরে আসছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের দায়িত্ব নেওয়ার পরই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বাংলায় কোনো ধরণের অবৈধ অনুপ্রবেশ সহ্য করা হবে না। তাঁর ‘ডিটেক্ট-ডিলিট-ডিপোর্ট’ নীতি প্রয়োগের পরেই সীমান্ত এলাকাগুলোতে এই ধরণের আত্মসমর্পণ ও স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার হিড়িক দেখা দিয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, যারা সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের অনেকেরই কোনো বৈধ নথি নেই। বিএসএফ এবং স্থানীয় প্রশাসন এখন এই প্রতিটি মামলার নথি যাচাই করছে। ওই মহিলার মতো যারা প্রেমের টানে বা প্রলোভনে পড়ে সীমান্ত পার হয়েছেন, তারাও এখন সরকারি নজরদারিতে। প্রশাসনিক মহলের মতে, সীমান্ত সুরক্ষা কেবল কঠোর নিরাপত্তার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং দালাল চক্রের এই নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হাকিমপুর চেকপোস্টের বর্তমান চিত্রটি তাই এক নতুন সতর্কবার্তা। একদিকে যেমন দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সমন্বয় বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত আবেগ বা প্রেমের আড়ালে সীমান্ত লঙ্ঘনের যে প্রবণতা এতদিন চলে আসছিল, তা এখন বড় ধরণের আইনি বিপত্তির মুখে। প্রশাসন জানিয়েছে, যারা এভাবে ধরা পড়ছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সীমান্তে এখন থমথমে পরিস্থিতি, আর সেই সঙ্গে চলছে অবৈধদের ফিরে যাওয়ার এই নজিরবিহীন মিছিল।





