বিশ্বের দরবারে ভারত যখন অগ্রগতির পথে, তখন দেশের একটি বড় অংশের নারীরা এখনও আটকে রয়েছেন বাল্যবিবাহের অভিশপ্ত বেড়াজালে। সম্প্রতি ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল (RGI)-এর ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (SRS) স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিপোর্ট ২০২৪’ প্রকাশ হতেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন করে বিতর্ক ও উদ্বেগ। সমস্ত সরকারি প্রচার ও সচেতনতা অভিযানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে বাল্যবিবাহের হার এখনও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
২০২৪ সালের এই রিপোর্টে দেখা গেছে, সারা দেশের অধিকাংশ নারী এখন ২১ বছর বা তার বেশি বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন, যা একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ২৫ শতাংশেরও বেশি তরুণী এখনও ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন। মোট বিবাহিত তরুণীদের মধ্যে ২.১ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে এবং ২৪.৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। এই তথ্যই প্রমাণ করে যে, বাল্যবিবাহের শিকড় কতটা গভীরে রয়ে গিয়েছে।
শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ড:
বাল্যবিবাহের হারে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খণ্ডে। গ্রামীণ অঞ্চলের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ শীর্ষে রয়েছে, যেখানে ১৮ বছরের আগেই বিয়ের হার ৫.৯ শতাংশ। এর ঠিক পরেই ৫.৮ শতাংশ হার নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঝাড়খণ্ড। তবে শহরের চিত্র আরও বেশি উদ্বেগজনক। শহরাঞ্চলে জাতীয় গড় যেখানে মাত্র ১.১ শতাংশ, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহের হার ৭.৬ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
তুলনামূলক চিত্র:
রিপোর্টে দেখা গেছে, দেশের রাজধানী দিল্লিতে বাল্যবিবাহের হার কার্যত শূন্য। অন্যদিকে কেরালায় এই হার অত্যন্ত নগণ্য—০.০৪ শতাংশ। এছাড়াও হিমাচল প্রদেশ এবং হরিয়ানাতেও বাল্যবিবাহের হার বেশ নিয়ন্ত্রণে। উত্তর প্রদেশ (১.৬ শতাংশ), অন্ধ্র প্রদেশ (১.৭ শতাংশ) এবং তেলেঙ্গানার (১.৮ শতাংশ) পরিস্থিতিও বাংলার তুলনায় অনেকটাই আশাব্যঞ্জক। সব মিলিয়ে ভারতে বর্তমানে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স ২৩.১ বছর হলেও, পূর্ব ও মধ্য ভারতের কিছু রাজ্যে এই গড় বয়স নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
কেন এই উদ্বেগ?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাল্যবিবাহের প্রভাবে মেয়েরা তাদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। অল্প বয়সে গর্ভধারণের ফলে মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় এই তরুণীরা আর্থিকভাবেও স্বনির্ভর হতে পারেন না। শিক্ষার হার বাড়ানো এবং সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা সত্ত্বেও কেন পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যে বাল্যবিবাহ রোধ করা যাচ্ছে না, তা এখন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই রিপোর্ট শুধুমাত্র সংখ্যাতত্ত্বের বিবরণ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক সংকটের সতর্কবার্তা।





