স্ত্রী কি পরিচারিকা? ঘরোয়া কাজ না করা ‘নিষ্ঠুরতা’ নয়, বম্বে হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে স্বস্তি নারীদের

দাম্পত্য সম্পর্ক এবং বিবাহিত নারীর অধিকারের পরিধি নিয়ে এক যুগান্তকারী রায় দিল বোম্বে হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, একজন বিবাহিত স্ত্রী কোনোভাবেই ‘গৃহপরিচারিকা’ নন। ফলে, রান্নাবান্না বা ঘর পরিষ্কারের মতো গৃহস্থালির কাজ করতে অস্বীকার করা বা অনিচ্ছা প্রকাশ করাকে কোনোভাবেই স্বামীর প্রতি ‘মানসিক বা শারীরিক নিষ্ঠুরতা’ (Cruelty) হিসেবে গণ্য করা যাবে না। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় নারীদের ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করল।

মামলার প্রেক্ষাপটটি ছিল দীর্ঘদিনের একটি বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত মামলা। ২০০২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এই দম্পতির বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে অশান্তি শুরু হয়। যদিও সেই বছরই মধ্যস্থতার মাধ্যমে তারা পুনরায় সংসার শুরু করার চেষ্টা করেন, কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। এরপর স্ত্রী শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান এবং ২০০৪ সালে স্বামী মুম্বই ফ্যামিলি কোর্টে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। স্বামীর অভিযোগ ছিল, তাঁর স্ত্রী চরম নিষ্ঠুর ব্যবহার করেন, বাড়ির কোনো কাজ করতে পারেন না এবং তাঁর বাবা-মায়ের কথা শোনেননি। অন্যদিকে, স্ত্রীও পালটা অভিযোগ করেন যে শ্বশুরবাড়ি থেকে পণের জন্য তাঁর ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। ২০১০ সালে ফ্যামিলি কোর্ট স্বামীর পক্ষ নিয়ে ডিভোর্স মঞ্জুর করে এবং স্ত্রীর খোরপোশের আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর স্ত্রী সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।

হাইকোর্টের বিচারপতি ভারতী দাঙ্গরে ও মঞ্জুশা দেশপাণ্ডের ডিভিশন বেঞ্চ এই মামলার শুনানিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। আদালত ফ্যামিলি কোর্টের আগের রায় খারিজ করে দেয় এবং স্বামীকে প্রাক্তন স্ত্রীকে মাসিক ২০ হাজার টাকা খোরপোশ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, বিয়ের পর একজন নারী পরিবারে একজন ‘পার্টনার’ বা ‘সঙ্গী’ হিসেবে প্রবেশ করেন, কোনোভাবেই তিনি পরিচারিকা নন। স্বামীর কোনো আইনি বা সামাজিক অধিকার নেই স্ত্রীকে জোর করে ঘরের সমস্ত কাজ করিয়ে নেওয়ার।

আদালত আরও জানিয়েছে, হিন্দু বিবাহ আইন বা ভারতীয় দণ্ডবিধির নিষ্ঠুরতার যে সংজ্ঞা রয়েছে, তার মধ্যে রান্নাবান্না না করা বা সাফাই কাজে অনিচ্ছা প্রকাশ করা কোনোভাবেই পড়ে না। আদালত জোর দিয়ে বলেছে, বৈবাহিক সম্পর্ক দাঁড়িয়ে থাকে পারস্পরিক সম্মান এবং বোঝাপড়ার ওপর। সংসারের কাজের বিভাজন সম্পূর্ণভাবে স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব বিষয়। একে আইনি হাতিয়ার বানিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানো চরম ভুল। আদালতের এই ঐতিহাসিক রায় কেবল একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং ভারতীয় সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ওপর একটি বড় ধাক্কা। এই রায় নারীদের সম্মান এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাকে ভবিষ্যতে আরও সুরক্ষিত করবে এবং দাম্পত্য জীবনে সমতার বার্তা দেবে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy