পশ্চিম ভারত মহাসাগর ও এডেন উপসাগরীয় এলাকায় ফের একবার ভারতীয় নৌসেনার বীরত্বের নিদর্শন মিলল। বুধবার মাঝসমুদ্রে এমভি মাসাল্লা ১ (MV Masallah 1) নামক একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করে নজির গড়ল ভারতীয় নৌসেনার গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘INS কলকাতা’। নৌসেনার এই তৎপরতা আবারও আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারতের শক্তিশালী উপস্থিতির জানান দিল।
সূত্রের খবর, এডেন উপসাগরের কাছে নিয়মিত টহল দিচ্ছিল INS কলকাতা। সেই সময় এমভি মাসাল্লা ১ বাণিজ্যিক জাহাজটি জলদস্যুদের কবলে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। বিপদ সংকেত পাওয়ার সাথে সাথেই নৌসেনা যুদ্ধজাহাজটি থেকে দ্রুত হেলিকপ্টার এবং নৌ-কমান্ডোদের দল পাঠানো হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জলদস্যুরা চম্পট দেয়। কমান্ডোদের নিখুঁত অভিযানে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই জাহাজটি সুরক্ষিত রয়েছে। ২০০৮ সাল থেকেই ভারত এডেন উপসাগরে জলদস্যুতা বিরোধী অভিযানে সক্রিয় রয়েছে, যা এই অঞ্চলের বাণিজ্যের সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নৌসেনার রণতরী INS কলকাতার বিশেষত্ব:
২০১৪ সালের আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাত ধরে নৌসেনায় যুক্ত হওয়া এই যুদ্ধজাহাজটি ভারতের তৈরি অন্যতম শক্তিশালী গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। এটি কেবল একটি জাহাজ নয়, বরং একটি ভ্রাম্যমাণ দুর্গ। এর অস্ত্রভাণ্ডারে রয়েছে মাঝারি ও স্বল্প পাল্লার বন্দুক, অত্যাধুনিক অ্যান্টি-এয়ার ও সারফেস মিসাইল এবং সাবমেরিন ধ্বংসকারী বিধ্বংসী অস্ত্র। নিখুঁত লক্ষ্যভেদের জন্য এতে রয়েছে আধুনিক সারফেস সার্ভেল্যান্স র্যাডার এবং শক্তিশালী সোনার সিস্টেম।
‘নেটওয়ার্ক অফ নেটওয়ার্কস’-এর কারিগরি দক্ষতা:
এই জাহাজের বিশেষত্ব এর অত্যাধুনিক ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। এতে রয়েছে ATM বেসড ইন্টিগ্রেটেড শিপ ডেটা নেটওয়ার্ক (AISDN), যা সমস্ত সেন্সর ও অস্ত্রের তথ্য আদান-প্রদান করে। জাহাজের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সামলাতে রয়েছে অটোমেটিক পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (APMS) এবং দূর থেকে যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অক্সিলিয়ারি কন্ট্রোল সিস্টেম (ACS)। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কমব্যাট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS), যা রিয়েল-টাইম যুদ্ধের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কমান্ডারদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
দেশীয় প্রযুক্তির গর্ব:
INS কলকাতার বেশিরভাগ প্রযুক্তি সম্পূর্ণ দেশীয় শিল্পোদ্যোগে তৈরি। কমব্যাট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থেকে শুরু করে জাহাজের হ্যাঙ্গার ডোর—সবই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এতে দুটি সি-কিং বা চেতক হেলিকপ্টার অনায়াসে ওঠানামা করতে পারে। জাহাজের মডিউলার নকশা কর্মীদের দীর্ঘদিনের সমুদ্রযাত্রায় বাড়তি স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করে। সব মিলিয়ে, এই জাহাজটি একদিকে যেমন ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, তেমনি প্রযুক্তিগত দিক থেকেও দেশকে বিশ্বের উচ্চাসনে বসিয়েছে। ভারতের এই ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক শক্তি বিশ্ব দরবারে এক বড় স্টেটমেন্ট হিসেবে গণ্য হচ্ছে।





