বাংলার রাজনীতির সমীকরণ কি তবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে? এতদিন পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় যে ‘বয়কট রাজনীতি’ বা রাজনৈতিক ভেদাভেদের ছবি দেখে অভ্যস্ত ছিল বাংলার মানুষ, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জমানায় তার ঠিক উল্টো ছবি ধরা পড়ল মঙ্গলবার কল্যাণীর মাটিতে। প্রশাসনিক বৈঠকের নামে নজিরবিহীন এক রাজনৈতিক বার্তায় উত্তাল হলো রাজ্য রাজনীতি। এদিন নদীয়া, হুগলি এবং উত্তর ২৪ পরগনার প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠকে রাজ্যের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর পাশে বসে থাকতে দেখা গেল বারাসতের তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে। শুধু তিনিই নন, এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে হাজির ছিলেন উত্তর ২৪ পরগনার দুই তৃণমূল বিধায়কও।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই বিবেচিত হচ্ছে। দিনকয়েক আগেই বারাসত জেলা সভাপতির পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর লোকসভায় তৃণমূলের ‘চিফ হুইপ’-এর পদ থেকে অপসারণ হওয়ার পর থেকেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এই বর্ষীয়ান সাংসদ। জোড়াফুল শিবিরের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব যখন চরমে এবং রাজনৈতিক মহলে তাঁর গেরুয়া শিবিরে যোগদানের জল্পনা যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়েই শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে তাঁর সশরীরে হাজিরা সেই জল্পনার আগুনে ঘি ঢালল।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বিরোধী দলের সাংসদ বা বিধায়কদের প্রশাসনিক বৈঠকে ব্রাত্য করে রাখার যে রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল, মুখ্যমন্ত্রী হয়েই শুভেন্দু অধিকারী সেই প্রথা ভেঙেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত জনপ্রতিনিধিকে প্রশাসনিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। সেই নীতি মেনেই এদিন উত্তর ২৪ পরগনার তৃণমূল সাংসদ ও বিধায়কদের চিঠি পাঠানো হয়।
উল্লেখ্য, রবিবারই তৃণমূলের বারাসত জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে লেখা চিঠিতে তিনি নিজের ক্ষোভের কথা গোপন করেননি। পাশাপাশি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনুরোধ করেছেন, যেন কোনও ‘ভুঁইফোঁড় সংস্থার’ বদলে দলের পুরনো ও নিষ্ঠাবান কর্মীদের গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিছুদিন আগেই সংসদে তৃণমূলের মুখ্যসচেতক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে, যার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর অভিমানী পোস্ট ছিল চোখে পড়ার মতো। এদিকে সম্প্রতি কাকলির কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ার ঘটনা তাঁর দলবদল নিয়ে জল্পনাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারীর এই পদক্ষেপকে অনেকেই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে দেখছেন। একদিকে প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, অন্যদিকে তৃণমূলের অসন্তুষ্ট নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারলেন তিনি। এই ছবিই বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে চলেছে, যেখানে উন্নয়নের প্রশ্নে দলমতের উর্ধ্বে উঠে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বর্তমান সরকার। তবে এই ‘সমন্বয়’ দীর্ঘস্থায়ী হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই অবস্থান তৃণমূলের অন্দরে বাড়তে থাকা অন্তর্কোন্দলকে প্রকাশ্য রাস্তায় এনে দাঁড় করাল, যা আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জোড়াফুল শিবিরের জন্য অশনি সংকেত।





