কেন ‘মমতা-বিদ্রোহী’রা বেছে নিলেন নতুন দল? মহারাষ্ট্র মডেল কেন ব্যর্থ হলো তৃণমূলে?

পশ্চিমবঙ্গ ও জাতীয় রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো দেশ। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া নেতা-নেত্রী—কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তারকা সাংসদ দেব, সায়নী ঘোষ ও ইউসুফ পাঠান—হঠাৎই যোগ দিলেন ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (NCPI)-তে। মহারাষ্ট্রের একনাথ শিণ্ডে বা অজিত পাওয়ারের মতো ‘আসল দল’ ও প্রতীকের লড়াইয়ে না গিয়ে এই নতুন রাজনৈতিক দলের ছাতার তলায় আসার নেপথ্যে রয়েছে সুচিন্তিত আইনি রণকৌশল।
কেন মহারাষ্ট্রের ‘প্লে-বুক’ অনুসরণ করলেন না বিদ্রোহীরা? রাজনৈতিক মহলের ধারণা ছিল, বিদ্রোহীরা হয়তো শিবসেনার আদলে তৃণমূলের নাম ও প্রতীকের দাবি তুলবেন। কিন্তু তাঁরা বেছে নিলেন এনসিপিআই-এর পথ। এর প্রধান কারণ হলো ‘সাদিক আলি’ মামলার আইনি জটিলতা। ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিয়মানুযায়ী, কোনো দলের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গেলে শুধু আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দলের সাংগঠনিক কাঠামোর (বুথ স্তর থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব) সমর্থন। তৃণমূলের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এতটাই নিশ্ছিদ্র যে, এই লড়াই জিততে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর সময় লেগে যেতে পারত। এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় বিদ্রোহী সাংসদরা তৃণমূলের হুইপের জালে আটকা পড়ে সাংসদ পদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তেন।
১০ম তফশিলের ভয় ও সংসদীয় বাস্তবতা: লোকসভায় দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-defection Law) রাজ্য বিধানসভার তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। ‘সুভাষ দেশাই’ মামলার রায় অনুযায়ী, শুধুমাত্র সংখ্যার জোরে দলবদল করলে স্পিকারের হাতে অযোগ্য ঘোষণার পূর্ণ ক্ষমতা থাকে। বিদ্রোহীরা জানতেন, ‘আসল তৃণমূল’ হওয়ার দাবি করলে নির্বাচন কমিশন এবং স্পিকারের দপ্তরে আইনি টানাপোড়েনে তাঁদের সংসদীয় নিরাপত্তা বিপন্ন হতো।
কেন এনসিপিআই? এনসিপিআই একটি নিবন্ধিত কিন্তু স্বীকৃতিহীন রাজনৈতিক দল (RUPP)। এর ফলে:
পরিচয় সংকট দূর: কোনো দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াই ছাড়াই বিদ্রোহীরা একটি স্বাধীন আইনি পরিচয় পেলেন।
সংসদীয় সুরক্ষা: নতুন দলে যোগ দেওয়ার ফলে তাঁরা তৃণমূলের হুইপ থেকে মুক্ত হলেন এবং নিজেদের সংসদীয় অবস্থান সুরক্ষিত রাখলেন।
এনডিএ-র সঙ্গে সমন্বয়: জুলাই মাসের বর্ষাকালীন অধিবেশনের আগেই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরামর্শ অনুযায়ী এই পদক্ষেপ বিদ্রোহীদের এনডিএ-র সঙ্গে সরাসরি কাজ করার একটি বাধাহীন পথ তৈরি করে দিল।
উপসংহার: কাকলি ঘোষ দস্তিদার বা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ নেতারা জানতেন, দীর্ঘস্থায়ী ও অনিশ্চিত প্রতীক-যুদ্ধের চেয়ে একটি পরিষ্কার বিচ্ছেদ এবং নতুন রাজনৈতিক পরিচয় অনেক বেশি কার্যকর। কালীঘাটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এই ‘কৌশলগত ডিগবাজি’ কার্যত বাংলার রাজনীতির সমীকরণকে এক নতুন মোড়ে নিয়ে এল।