লাল গ্রহ মঙ্গল সবসময়ই রহস্যের আধার। এবার নাসার পারসিভেরান্স রোভারের (Perseverance Rover) পাঠানো একটি নতুন ছবি বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহল ও জল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৩ মে, মঙ্গলের মাটিতে রোভারটির ১৮৫৯তম কার্যদিবসে অর্থাৎ ‘সোল ১৮৫৯’-এ এই চাঞ্চল্যকর ছবিটি তোলা হয়। ধূ ধূ লাল প্রান্তরের মাঝে তিনটি পাথরের একটি বিশেষ বিন্যাস দেখে নেটিজেনদের একাংশ মশগুল হয়েছে ‘এলিয়েন’ বা ভিনগ্রহী প্রাণীর অস্তিত্ব নিয়ে।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পাথরের টুকরোগুলো এমনভাবে একে অপরের ওপর সাজানো রয়েছে, যা দেখে মনে হয় যেন কোনো শিল্পী যত্ন করে বসিয়ে রেখেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবিটি ভাইরাল হতেই প্রশ্ন উঠছে—এটা কি শুধুই প্রকৃতির খেলা, নাকি অন্য কোনো অতিপ্রাকৃত বা বুদ্ধিমান সত্তার হাতের কাজ? অনেকেই মন্তব্য করেছেন, ছবিটি দেখে মনে হচ্ছে কেউ বা কারা পাথরগুলো সাজিয়ে একটি বিশেষ ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নাসা এবং জনপ্রিয় মহাকাশ গবেষণা বিষয়ক পোর্টাল ‘স্পেস ডট কম’-এর তথ্য অনুযায়ী, এগুলো কোনো আলাদা পাথর নয়। বরং এটি একই বিশাল পাথরের অংশ, যা কোটি কোটি বছর ধরে আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতির বিবর্তনের কারণে এমন আকার ধারণ করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মঙ্গলে অতীতে বয়ে চলা প্রবল বাতাস এবং প্রাচীন জলস্রোতের কারনেই পাথরের গায়ে এই ক্ষয়িষ্ণু গঠন তৈরি হয়েছে।
আজকের মঙ্গল গ্রহ শুকনো ও প্রাণহীন মনে হলেও, বিজ্ঞানীরা বহু আগে থেকেই নিশ্চিত যে সেখানে একসময় নদী, হ্রদ এমনকি বৃষ্টির অস্তিত্বও ছিল। কিউরিওসিটি রোভারের দীর্ঘ গবেষণাও প্রমাণ করেছে যে, মঙ্গল গ্রহের বর্তমান ভূপ্রকৃতি গঠনে বাতাসের ভূমিকা অপরিসীম। পৃথিবীর মরুভূমিগুলোতে যেমন বাতাস ও বালির ঘর্ষণে অদ্ভুত সব পাথরের অবয়ব তৈরি হয়, লাল গ্রহেও ঠিক একইভাবে পাথরের ক্ষয় হয়েছে।
এটিই প্রথম নয় যে মঙ্গল গ্রহের কোনো অদ্ভুত গঠন মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। এর আগেও পারসিভেরান্স রোভার চিতা বাঘের ছোপযুক্ত পাথর, সুতোর মতো সূক্ষ্ম শিলাখণ্ড এবং পপকর্নের মতো দেখতে পাথরের সন্ধান পেয়েছে। ১৯৭৬ সালে ‘ভাইকিং ১’ মহাকাশযানের পাঠানো ‘ফেস অন মার্স’ (Face on Mars) বা মঙ্গলের বুকে মানুষের মুখের মতো দেখতে পাথরের ছবিটিও বিশ্বজুড়ে বিশাল আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী উন্নত গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, আলো-ছায়ার খেলায় ওগুলো ছিল স্রেফ প্রাকৃতিক ঘটনা।
নাসার গবেষকরা আশা করছেন, নতুন এই পাথরের গঠনটিও মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জোগাবে। এই পাথরগুলো কীভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হলো, তা বিশ্লেষণ করলে প্রাচীন মঙ্গলের পরিবেশ ও জলবায়ু সম্পর্কে নতুন অনেক অজানা তথ্য জানা সম্ভব। আপাতত, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ছবিটি নিয়ে বিতর্ক চললেও, বিজ্ঞানীরা একে মহাজাগতিক পরিবর্তনের একটি সুন্দর নিদর্শন হিসেবেই দেখছেন। বিজ্ঞানের হাত ধরে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এই রহস্যময় পাথরের বিন্যাসের পেছনের সত্যটিও উন্মোচিত হবে।





