রাতারাতি বদলে গেল জ্বালানি আমদানির নিয়ম! রেকর্ড মূল্যে তেল কিনছে বাংলাদেশ? তোলপাড় আমলা মহলে!

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা সামরিক অস্থিরতার জেরে বিশ্বজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে জ্বালানি তেলের সংকট। এই মারাত্মক সংকট থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে সুরক্ষিত রাখতে এবং জরুরি ভিত্তিতে তেলের জাতীয় মজুত বৃদ্ধি করতে প্রথাগত দরপত্র প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। বিশেষ পরিস্থিতিতে ডিপিএম (ডিরেক্ট পারচেজ মেথড) বা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে মোট ১২টি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে তেল সরবরাহের বিশেষ অনুমতি বা কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন)-র অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গিয়েছে, মে মাসের মাঝামাঝি সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও এই তালিকায় থাকা কোনও সংস্থাই এখনও পর্যন্ত দেশে এক ফোঁটা তেলও সরবরাহ করতে সক্ষম হয়নি, যা অন্তর্বর্তীকালীন মজুত ব্যবস্থাপনাকে চরম উদ্বেগের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এই জরুরি কার্যাদেশ পাওয়া কোম্পানিগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এগুলো মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, নেদারল্যান্ড, হংকং, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া এবং জাপানের মতো প্রভাবশালী বাণিজ্যিক কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করছে। এদেরকে অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল, অকটেন এবং ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) সরবরাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কার্যাদেশ পাওয়া এই ১২টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র দুটি কোম্পানি এ যাবৎকালে তাদের পিজি (পারফরম্যান্স গ্যারান্টি) বা প্রয়োজনীয় আর্থিক জামানত জমা দিতে পেরেছে। বাকিদের মধ্যে কেবল একটি মাত্র কোম্পানি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পিজি দেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা সামগ্রিক আমদানি প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।

সরাসরি সরকারের উচ্চপর্যায়ের গ্রিন সিগন্যাল নিয়ে গৃহীত এই সিদ্ধান্তটির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল মূলত মার্চ মাসে। ইরান এবং সংশ্লিষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকালীন উত্তেজনার কারণে যখন বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ চেইন প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়, ঠিক তখনই দেশের অভ্যন্তরে তেলের চরম সংকট এড়াতে কোনও রকম প্রথাগত টেন্ডার বা দরপত্র ছাড়াই তড়িঘড়ি করে তেল কেনার এই বিশেষ উদ্যোগ নেয় সরকার। এই বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাকে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে পরিস্থিতির গভীরতা স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি জানান, যুদ্ধের আকস্মিক অভিঘাত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অচলাবস্থা দূর করতেই সরকার এই বিশেষ আইনি ছাড়ের আশ্রয় নিয়েছিল। দেশের সাধারণ মানুষ যাতে ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কায় আতঙ্কিত বা প্যানিকড হয়ে বাজারে তেল মজুত করা শুরু না করে, তা নিশ্চিত করাই ছিল এই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মূল লক্ষ্য।

জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে আরও বলেন, “আমাদের প্রথাগত জিটুজি (সরকার টু সরকার) চুক্তি ছিল কাতারের সাথে। কিন্তু যুদ্ধকালীন জটিলতার কারণে তারা ‘ফোর্স মেজর’ (অনিবার্য পরিস্থিতি) জারি করে থমকে বসে গেছে। একই অবস্থা তৈরি হয়েছে সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও। এই পরিস্থিতিতে দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে আমাদের বাধ্য হয়েই অন্য উৎস থেকে তেল আমদানির পথ খুঁজতে হচ্ছে। যখন যে ধরনের জ্বালানির প্রয়োজন হবে, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের স্পট মার্কেট বা তাৎক্ষণিক উন্মোচিত বিকল্পগুলোর দিকেই ঝুঁকতে হবে। আমরা খুব ভালো করেই জানি যে, সব কটি কোম্পানির কাছ থেকে হয়তো কাঙ্ক্ষিত সময়ে তেল আসবে না। তবুও আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি এবং সবাইকে একটি ‘ফেয়ার চান্স’ বা সমান সুযোগ দিচ্ছি। এর মধ্যে যে কয়েকটি সংস্থাও সফলভাবে তেল নিয়ে আসতে পারবে, তাতেই আমাদের অভ্যন্তরীণ তেলের মজুত লক্ষ্যণীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।”

তবে এই বিশেষ ব্যবস্থায় তেল আমদানির কার্যাদেশ বণ্টন এবং কোম্পানিগুলোর দর প্রস্তাবের মধ্যে ব্যাপক অসঙ্গতি থাকায় ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মার্চ মাসে যখন সংকট চরমে পৌঁছায়, তখন বিপিসির কাছে বিশ্বের অর্ধশতাধিক কোম্পানি তেল সরবরাহের প্রাথমিক প্রস্তাব জমা দিয়েছিল। যাচাই-বাছাইয়ের পর যে কয়েকটি সংস্থাকে শেষ পর্যন্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়, তাদের প্রস্তাবিত তেলের দরে আকাশ-পাতাল পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ডিজেল সরবরাহের জন্য দুবাই ভিত্তিক ‘পেট্রোগ্যাস’ যেখানে ব্যারেলপ্রতি ১৭৫ ডলার দর হাঁকিয়েছিল, সেখানে নেদারল্যান্ড ভিত্তিক ‘এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’ প্রস্তাব দেয় রেকর্ড ২২১ ডলারের। সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ‘এ অ্যান্ড এ এনার্জি’ নামের একটি মার্কিন কোম্পানি অবিশ্বাস্যভাবে মাত্র ৭৫ ডলারে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে সরকারের অনুমোদন পেয়ে যায়। সংকটকালীন সময়ে বিশ্ববাজারের গড় সূচক ও বাস্তবতার তুলনায় এই দর প্রস্তাব অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও অবাস্তব বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা, যা মে মাসের মাঝামাঝি সময়েও তেল না আসার অন্যতম বড় কারণ হতে পারে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy