পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এবং তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করল রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি মতো রাজ্যে চালু করতে চলেছে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের অধীনে যোগ্য মহিলারা প্রতি মাসে সরাসরি নিজেদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। পূর্বতন সরকারের জনমুখী প্রকল্পগুলির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক উপায়ে এই পরিষেবা আমজনতার দুয়ারে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর বর্তমান প্রশাসন।
নবান্নে আয়োজিত প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, পূর্বতন সরকারের সমস্ত জনমুখী প্রকল্পই রাজ্যে সচল থাকবে। তবে রাজ্য জুড়ে প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা আনা এবং অযোগ্য সুবিধাভোগীদের বাদ দেওয়ার জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই এবার পশ্চিমবঙ্গ মহিলা, শিশু ও সমাজকল্যাণ দফতরের অধীনে সম্পূর্ণ নতুন এবং আধুনিক ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ পোর্টাল চালু করার জোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দফতরের বিভাগীয় মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে, এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে গেলে আবেদনকারীদের সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে অনলাইনেই ফর্ম পূরণ করতে হবে। আগামী জুন মাস থেকেই এই প্রকল্পের টাকা সরাসরি উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো শুরু হবে।
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে অত্যন্ত সহজ উপায়ে সাজানো হয়েছে এই নতুন পোর্টালটি। আবেদন করার জন্য আবেদনকারীকে প্রথমেই ইন্টারনেটে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ লিখে সার্চ করে এর অফিসিয়াল সরকারি পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। পোর্টালটি চালু হওয়ার পর তিনটি সহজ ধাপে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে। প্রথম ধাপে, আবেদনকারীকে তাঁর সচল মোবাইল নম্বর দিয়ে ওটিপি (OTP) ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সিস্টেমে লগইন করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে, আবেদনকারীর নাম, জন্মতারিখ, পিতা বা স্বামীর নাম এবং স্থায়ী ঠিকানা নির্ভুলভাবে পূরণ করতে হবে। এর পাশাপাশি নিজস্ব আইডেন্টিটি কার্ডের বিবরণ, ভোটার কার্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের পাসবুকের কপি স্ক্যান করে ডিজিটাল ফর্মে আপলোড করতে হবে। একই সাথে আবেদনকারীর একটি সাম্প্রতিক রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবিও আপলোড করতে হবে নির্দিষ্ট কলামে। তৃতীয় ও শেষ ধাপে, যে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে টাকা ঢুকবে, সেই অ্যাকাউন্টের নম্বর এবং আইএফএসসি (IFSC) কোড অত্যন্ত সতর্কতার সাথে টাইপ করতে হবে। সমস্ত তথ্য পুনরায় যাচাই করে ফর্মটি সাবমিট করলেই একটি ‘অ্যাকনলেজমেন্ট রসিদ’ (Acknowledgement Receipt) জেনারেট হবে, যা ভবিষ্যতের জন্য ডাউনলোড বা প্রিন্ট করে রাখা বাধ্যতামূলক।
এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য রাজ্য সরকার নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিয়েছে। আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং তাঁর বয়স ২৫ বছরের বেশি হতে হবে। মূলত অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মহিলারাই এই অনুদান পাবেন, যার জন্য সরকার একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক আয়ের সীমা বেঁধে দেবে। পাশাপাশি আবেদনকারীর বিপিএল (BPL), এএওয়াই (AAY) কিংবা পিএইচএইচ (PHH) ক্যাটাগরির রেশন কার্ড থাকা জরুরি। অন্যদিকে, কোনও স্থায়ী বা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী কিংবা সরকারের বেঁধে দেওয়া বার্ষিক আয়ের সীমার উর্ধ্বে থাকা পরিবারের মহিলারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। শহুরে বা গ্রামীণ এলাকার ইন্টারনেট পরিষেবার খামতির কথা মাথায় রেখে, অনলাইন ব্যবস্থার পাশাপাশি লোকাল ব্লক অফিস (BDO) বা পুরসভা (Municipality) অফিসের মাধ্যমে অফলাইনে ফর্ম সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার একটি বিকল্প ভাবনাও রাখা হতে পারে, যদিও এই বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত নির্দেশিকা এখনও প্রকাশ পায়নি। সম্পূর্ণ জালিয়াতিমুক্ত ও স্বচ্ছ উপায়ে প্রকৃত দুঃস্থ মহিলাদের হাতে জুনের শুরুতেই টাকা পৌঁছে দেওয়াই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।





