টলিপাড়ার অন্দরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সম্প্রতি পরিচালক অংশুমান প্রত্যুষের ছবির শ্যুটিং ঘিরে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তাতে ইন্ডাস্ট্রির কর্মপদ্ধতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। অভিযোগের তির সরাসরি চিত্রগ্রাহকদের গিল্ডের দিকে। পরিচালকদের দাবি, গিল্ডের অন্যায্য হস্তক্ষেপের কারণে কাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং প্রযোজকরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
ঘটনার সূত্রপাত অংশুমান প্রত্যুষের একটি প্রজেক্টকে কেন্দ্র করে। পরিচালক নিজের টিমের চিত্রগ্রাহক সুমন মাজিকে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গিল্ডের তরফে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, সুমনকে নেওয়া যাবে না, পরিবর্তে গিল্ড নির্ধারিত অন্য কাউকে নিতে হবে। পেশাদারিত্বের খাতিরে অংশুমান রাজি হলেও ফলাফল হয় ভয়াবহ। পরিচালকের কথায়, “গিল্ড থেকে যাকে পাঠানো হয়েছিল, তার কাজের ধরনে আমি বুঝেছিলাম সমস্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে প্রযোজক বিরক্ত হয়ে কাজই বন্ধ করে দেন।”
অংশুমান বর্তমানে একটি নতুন প্রজেক্টের কাজ করছেন। সেখানেও একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি। গিল্ডের দাবি, শ্যুটিং ফ্লোরে পরিচালকের পরিচিত চিত্রগ্রাহক থাকতে পারবেন না। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই ইমেল মারফত নিজের আপত্তির কথা জানিয়েছেন পরিচালক। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, নিজের টিমের সঙ্গে কাজ করতে না দিলে শ্যুটিং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। এই বিষয়ে গিল্ডের প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কোনও সদুত্তর মেলেনি।
একই সুর শোনা গিয়েছে পরিচালক পারমিতা মুন্সীর গলায়। তিনি ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে চলা ‘জোর জবরদস্তি’র এক কঙ্কালসার চেহারা তুলে ধরেছেন। পারমিতার অভিযোগ, অতীতে তাঁর একটি ছবির শ্যুটিং চলাকালীন, যেখানে কোনও অভিনেতা বা সংলাপ ছিল না—শুধুমাত্র প্রকৃতির দৃশ্য বা ‘মন্টাজ’ শ্যুট করা হচ্ছিল, সেখানেও গিল্ডের সম্পাদক মহম্মদ হাসানুজ্জামান জোর করে ড্রেসার, মেকআপ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ইলেকট্রিশিয়ান এবং ট্রলি সেটিং টেকনিশিয়ান নিতে বাধ্য করেন। প্রশ্ন উঠছে, ন্যাচারাল লাইটে প্রকৃতির শ্যুটিংয়ে এত লটবহরের কী প্রয়োজন? অযথা টেকনিশিয়ানদের বসিয়ে রাখা তাঁদের জন্যও কি অসম্মানজনক নয়?
টলিউডের একটি বড় অংশের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে ফেডারেশনের অজান্তেই কিছু গিল্ড নিজেদের একগুঁয়ে সিদ্ধান্ত পরিচালক ও প্রযোজকদের ওপর চাপিয়ে দেয়। আর সেই দায়ভার বর্তায় ফেডারেশনের ওপর। অংশুমান প্রত্যুষ জানিয়েছেন, তিনি গিল্ডের সঙ্গে সহযোগিতা করেই কাজ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিস্থিতি তাঁকে গিল্ডের সদস্য ছাড়াই শ্যুটিংয়ের কথা ভাবতে বাধ্য করেছে।
রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর এখন টলিপাড়ার নজর টেকনিশিয়ান ফেডারেশন এবং বিভিন্ন গিল্ডের নিয়মকানুনের দিকে। স্টুডিও পাড়ার অলিগলিতে কান পাতলে একটাই দাবি শোনা যাচ্ছে—ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাতে হলে এই ‘গিল্ড-রাজ’ বা ছড়ি ঘোরানোর সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। সৃজনশীল কাজে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বাড়তে থাকলে বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।





