চিরনিদ্রায় সবুজ-মেরুনের ‘ত্রাতা’, শেষ বিদায়েও মোহনবাগান তাঁবুতে আবেগের বিস্ফোরণ!

‘ম’-এ মোহনবাগান। এই তিন অক্ষরের শব্দই ছিল স্বপনসাধন ওরফে টুটু বসুর জীবনের ধ্রুবতারা। তিনি রসিকতা করে বলতেন, “আমারও ম- দোষ আছে।” সেই দোষ ছিল মোহনবাগানের প্রতি এক অতলান্ত ভালোবাসা। বুধবার সকালে যখন তাঁর নশ্বর দেহ প্রিয় ক্লাবের প্রাঙ্গণে পৌঁছল, তখন গঙ্গার ধারের সবুজ-মেরুন তাঁবুতে নেমে এল এক ভারী নিস্তব্ধতা। যে মন্দিরের তিনি ছিলেন প্রধান পুরোহিত, যেখানে তাঁর আঙুল হেলনে বদলে যেত ময়দানী রাজনীতির ইতিহাস, আজ সেই মাঠেই তিনি ফিরলেন—তবে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে।

মোহনবাগান ক্লাব ছিল টুটু বোসের রক্তে, তাঁর প্রতিটা নিঃশ্বাসে। আজ ক্লাব লনে তিল ধারণের জায়গা নেই। ক্যান্টিনের সামনে মানুষের জটলা, তাঁবুর ভিতরে কান্নার রোল। ফুলে ঢাকা তাঁর শান্ত শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণ করছিলেন ক্লাব কর্তারা। অথচ সবার কানে যেন বাজছে সেই প্রাণখোলা অট্টহাসি। গত বছরের ২৯ জুলাইয়ের সেই সন্ধেটা আজ বারবার ফিরে আসছে সবার মনে। নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে ‘মোহনবাগান রত্ন’ সম্মান হাতে নিয়ে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন এই মানুষটি। বলেছিলেন, “এটা হাতে পেয়ে মনে হচ্ছে আমি আকাশের চাঁদ পেয়েছি।”

সেই মঞ্চেই যেন নিজের বিদায়বার্তা লিখে গিয়েছিলেন তিনি। জীবনের শেষলগ্নে পৌঁছে হাসতে হাসতেই আবদার করেছিলেন, “আমি মারা যাওয়ার পর মোহনবাগান ক্যান্টিনটা যেন আমার নামে করে দেওয়া হয়।” স্টু-পাউরুটির গন্ধ মাখা সেই আড্ডার ঠেকই ছিল তাঁর প্রাণের আরাম। আজ যখন সেই ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন চারদিকের পরিবেশ ছিল বিষণ্ণ। তিনি হয়তো আগেই টের পেয়েছিলেন মহাকালের ডাক। তাই তো আফসোস করে বলেছিলেন, “শরীরটা ভেঙে যাচ্ছে, হয়তো আর তোদের সঙ্গে আমার দেখা হবে না।”

টুটু বোস শুধু একজন কর্মকর্তা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মোহনবাগানীদের কাছে এক আবেগের নাম। ক্লাবের ১৯ জন আজীবন সদস্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা— “আমি চাই ২০ নম্বর লাইফ মেম্বার যেন পরজন্মে টুটু বোস হয়েই ফিরে আসে।” এমন নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ কি আর আধুনিক ফুটবল ময়দানে দেখা যাবে? আজ তিনি নেই, কিন্তু মোহনবাগান তাঁবুর প্রতিটি ইট, প্রতিটি ঘাস আর গ্যালারির আবেগ তাঁর নাম জপ করবে। তিনি থেকে যাবেন সবুজ-মেরুন পতাকার ভাঁজে, চিরচেনা সেই গলায় ধ্বনিত হবে— “ম-এ মোহনবাগান।”

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy