‘কারও বাবার রাস্তা নয়!’ ক্ষমতা হারোতেই মমতার পাড়ায় বিজেপির ঝাণ্ডা, অভিষেকের নিরাপত্তা নিয়ে চরম বিদ্রোহ

“সময় চেয়ার দেয়, আবার সময় হলে সেই চেয়ার কেড়েও নেয়”—বাংলার রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই প্রবাদটিই এখন সবথেকে বড় ধ্রুবসত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয় এবং দীর্ঘ এক দশকের জমানার অবসানের পর মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল কালীঘাটের চিরপরিচিত ছবিটা। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে থেকে গার্ডরেল ও ব্যারিকেড সরানোর রেশ কাটতে না কাটতে এবার বড় পদক্ষেপ নিল লালবাজার। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির বাইরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ পিকেট এক ধাক্কায় তুলে নেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

লালবাজার সূত্রে খবর, বুধবার ৬ই মে সকাল সাড়ে ৬টা থেকেই এই নির্দেশিকা কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৮৮ এ হরিশ মুখোপাধ্যায় রোডের বাড়ির বাইরের পিকেট, ১২১ কালীঘাট রোডের অফিস ও বাড়ির বাইরের অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী এবং ৯ ক্যামাক স্ট্রিটের দপ্তরের বাইরের নিরাপত্তা বলয় পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে যে এলাকাগুলো ছিল সাধারণ মানুষের জন্য কার্যত ‘নিষিদ্ধ পল্লি’, সেখানে এখন অবাধ যাতায়াত শুরু হয়েছে।

সবথেকে চাঞ্চল্যকর ছবি ধরা পড়েছে কালীঘাটের পটুয়াপাড়ায়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয়ের ঢিল ছোড়া দূরত্বে এখন উড়ছে বিজেপির গেরুয়া পতাকা। রাজ্যের এই ঐতিহাসিক পালাবদলের পর এত দিন মুখ বুজে থাকা স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা এখন ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, মমতা ও অভিষেকের ‘হাই প্রোফাইল’ নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে পটুয়াপাড়ার শিল্পীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হয়েছিল।

এক শিল্পী সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সপাটে বলেন, “এটা কালীঘাট রোড, কারও বাবার রাস্তা নয়! এখানে ওঁর বাড়ি বলে কোনও গাড়ি দাঁড়াতে দেওয়া হতো না। আমরাই ভোট দিয়ে দিদিকে এনেছিলাম, আর ওঁরা আমাদের পিছনেই লাথি মারছেন? এখানকার ব্যবসার দফারফা হয়ে গিয়েছিল এই নিরাপত্তার অত্যাচারে। মানুষ এবার অতিষ্ঠ হয়ে জবাব দিয়েছে।” শিল্পীদের দাবি, ভিভিআইপি নিরাপত্তার দাপটে তাঁদের রুটিরুজি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পটুয়াপাড়ার মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল এই কড়াকড়িতে।

ভোটের ফল বেরোনোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যেভাবে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা এক ধাক্কায় কমিয়ে দেওয়া হলো, তাকে ক্ষমতার হাতবদল ও ‘প্রশাসনিক রদবদলে’র থেকেও বড় এক সামাজিক বার্তা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যে পুলিশ প্রশাসন কাল পর্যন্ত তাঁদের ছায়ার মতো আগলে রাখত, আজ সেই লালবাজারের নির্দেশেই সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে খোদ ‘যুবরাজ’-এর নিরাপত্তা বলয়। কালীঘাটের অলিগলিতে এখন শুধু পরিবর্তনের হাওয়াই নয়, বরং পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে পরতে পরতে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy