শিক্ষিত সমাজ কি এবার ব্রাত্য করল কাস্তে-হাতুড়িকে? পরাজয়ের পর বামেদের বড় স্বীকারোক্তি, হারের নেপথ্যে কি তবে নতুন সমীকরণ?

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসতেই বাম শিবিরে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা গ্রাস করেছে। যে শিক্ষিত শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজ একসময় বাম রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল, সেই সমাজই এবার সপাটে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে কাস্তে-হাতুড়ি প্রতীকের দিক থেকে। কেন এমন হলো? কেন লড়াইয়ের ময়দানে থাকা সত্ত্বেও শিক্ষিত ভোটারদের আস্থা অর্জন করা গেল না? নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্যালোচনায় নিজেদের এই শোচনীয় ব্যর্থতার কথা নজিরবিহীনভাবে মেনে নিল বামফ্রন্ট নেতৃত্ব।

ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি শাহজাহান পুরকাইতের রিপোর্ট অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বামেদের বড় পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলো শহরের ভোটারদের নিঃশব্দ প্রত্যাখ্যান।

কেন এই মুখ ফেরানো? বামেদের ময়নাতদন্ত: মঙ্গলবার গণনার পর দেখা গেছে, কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলোর শিক্ষিত শহুরে বুথগুলোতে বামেদের ভোট প্রাপ্তির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। সিপিএমের অন্দরে হওয়া প্রাথমিক আলোচনায় কয়েকটি মূল কারণ উঠে এসেছে:

  • বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে না পারা: শহর ও উপনগরীর ভোটারদের একাংশের মতে, তৃণমূল এবং বিজেপির তীব্র দ্বিমুখী লড়াইয়ের মাঝে বামেরা নিজেদের ‘তৃতীয় বিকল্প’ হিসেবে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।

  • তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন: শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা কর্মসংস্থান ও আধুনিক অর্থনীতির কথা ভাবছেন, সেখানে বামেদের পুরনো আন্দোলন বা তত্ত্বকথা অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের কাছে আকর্ষণীয় হয়নি।

  • ভোট মেরুকরণের শিকার: বিজেপির হিন্দুত্ববাদ এবং তৃণমূলের উন্নয়ন ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের লড়াইয়ে বামেদের ইস্যুগুলো চাপা পড়ে গেছে। শহুরে মধ্যবিত্ত ভোটাররা মনে করেছেন, ভোট নষ্ট না করে লড়াইয়ের প্রধান কোনো এক পক্ষকে বেছে নেওয়া জরুরি।

ভুল স্বীকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: পরাজয় নিয়ে রাখঢাক না করে বাম নেতৃত্বের দাবি, “আমরা মানুষের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু শিক্ষিত শহুরে মধ্যবিত্তের যে ক্ষোভ বা আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা হয়তো সঠিক ভাষায় স্পর্শ করতে পারিনি। এটা আমাদের সাংগঠনিক ও প্রচারগত ব্যর্থতা।” তাঁরা আরও জানিয়েছেন যে, কেবল আন্দোলন দিয়ে নয়, আধুনিক মানুষের মানসিকতা বুঝে আগামী দিনে সংগঠনের খোলনলচে বদলানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

রাজনীতির নতুন মোড়: বিশ্লেষকদের মতে, বামেদের এই পরাজয় কেবল ভোটের হার কমে যাওয়া নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট বুদ্ধিজীবী শ্রেণির সমর্থন হারিয়ে ফেলা। শহর যদি হাতছাড়া হয়, তবে আগামী দিনে রাজ্যে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়া লাল শিবিরের জন্য কঠিন হবে।

নির্বাচনী পর্যালোচনায় এই ‘ব্যর্থতা’ স্বীকার কি বামেদের আগামী দিনের নতুন কোনো রণকৌশলের ইঙ্গিত? নাকি বাংলার রাজনীতিতে বামপন্থা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ার সংকেত? এই প্রশ্নই এখন ঘোরাফেরা করছে রাজনৈতিক মহলে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy