“কয়েকটি জেলায় তৃণমূল খাতাও খুলতে পারবে না”— ভোট প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর করা সেই ভবিষ্যৎবাণীই যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল ২০২৬-এর বঙ্গ নির্বাচনে। কোচবিহার থেকে ঝাড়গ্রাম, আর পূর্ব মেদিনীপুর থেকে পশ্চিম বর্ধমান— রাজ্যের অন্তত ১০টি জেলায় কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলার মসনদে এখন বসতে চলেছে গেরুয়া শিবির।
ভোটের পাটিগণিতে উলটপুরাণ এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দিয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ ভোট। তথ্য বলছে, বিজেপি এবার শুধু আসন বাড়ায়নি, শতাংশের নিরিখেও শাসকদলকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। যেখানে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ৪১ শতাংশ, সেখানে বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট। গত বিধানসভা নির্বাচনে চিত্রটা ছিল ঠিক উল্টো। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বারবার দাবি করেছিলেন, “আর ৫ শতাংশ ভোট বাড়াতে পারলেই সরকার গড়বে বিজেপি।” বাস্তবে ঠিক সেই ৫ শতাংশ ব্যবধানেই তৃণমূলকে পরাজিত করে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার গড়তে চলেছেন মোদী-শাহ জুটি।
কেন এই ঐতিহাসিক পালাবদল? রাজনৈতিক পণ্ডিতদের মতে, কোনো একটি কারণে নয়, বরং একাধিক বিষয়ের সমাবেশে এই পতন।
রেকর্ড ভোটদান: ২০১১ সালে বাম পতনের সময় ভোট পড়েছিল ৮৪.৭২ শতাংশ। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন। এই বিপুল ভোটদান সরাসরি শাসকদলের বিপক্ষে গিয়েছে।
ভোট ট্রান্সফার: ২০২১-এর তুলনায় তৃণমূলের ভোট প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে, আর ঠিক সমপরিমাণ ভোট বেড়েছে বিজেপির। অর্থাৎ ঘাসফুলের ভোট সরাসরি পদ্মশিবিরে চলে গিয়েছে।
‘SIR’ ও স্বচ্ছ ভোট: স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা ‘সার’-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ সন্দেহভাজন নাম বাদ যাওয়া এবং নির্বাচন কমিশনের কড়া নিরাপত্তায় দুই দফায় ভোট হওয়া শাসকদলের ‘ছাপ্পা’র সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দুর্নীতি ও কর্মসংস্থান: নেতাদের দুর্নীতি, শিল্পায়নের অভাব এবং সরকারি নিয়োগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের বীতশ্রদ্ধ হওয়া এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারণ।
ফিকে হলো ‘মমতা ম্যাজিক’ তৃণমূল নেত্রী বারবার প্রচার করেছিলেন, ২৯৪টি আসনে তিনিই প্রার্থী। কিন্তু এবার আর সেই ‘মমতা ম্যাজিক’ কাজ করেনি। এমনকি মালদা, মুর্শিদাবাদ বা উত্তর ২৪ পরগনার মতো সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলিতেও আইএসএফ বা বাম-কংগ্রেসের ভোট কাটাকুটিতে লাভবান হয়েছে বিজেপি। ফলে যে সংখ্যালঘু ভোট ছিল তৃণমূলের তুরুপের তাস, তাতেও এবার বড়সড় ধস নেমেছে।
সব মিলিয়ে, ২০১৬ সালে মাত্র ৩টি আসন থেকে শুরু করে ২০২৬-এ ২০০-র গণ্ডি পার— বিজেপির এই উত্থান বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করল। এখন দেখার, এই নতুন সরকার উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এল, তা তারা কতটা পূরণ করতে পারে।





