কানাডার জাতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিস্ফোরক তথ্য সামনে এনেছে সেদেশের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা ‘কানাডিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস’ (CSIS)। ২০২৫ সালের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে, খালিস্তানি চরমপন্থা বর্তমানে কানাডার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক গুরুতর এবং ক্রমবর্ধমান হুমকি।
‘সিবিকেই’ পরিভাষার প্রথম প্রয়োগ
এবারের প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থাটি প্রথমবারের মতো “কানাডা-ভিত্তিক খালিস্তানি চরমপন্থী” বা (CBKE) পরিভাষাটি ব্যবহার করেছে। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো কানাডার উদার ও গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের উগ্র বিচ্ছিন্নতাবাদী মতাদর্শ প্রচার করছে। শুধু তাই নয়, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ ও সংগঠিত করার কাজও চালাচ্ছে।
গোপন অর্থায়ন ও সাধারণ মানুষের বিপদ
সিএসআইএস-এর রিপোর্টে সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে চরমপন্থীদের অর্থ সংগ্রহের কৌশল। গোয়েন্দাদের দাবি, এই নেটওয়ার্কগুলো অত্যন্ত গোপনে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ও অসচেতন নাগরিকদের বিভ্রান্ত করে তাদের থেকে অনুদান সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই অর্থ বিদেশের মাটিতে সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও, এই চরমপন্থী গোষ্ঠীর সদস্যরা বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে যাতে স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখা যায়।
শান্তিপূর্ণ সমর্থন বনাম সহিংস সন্ত্রাস
তবে গোয়েন্দা সংস্থাটি একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য টেনে জানিয়েছে যে, কানাডার আইন অনুযায়ী খালিস্তানের সমর্থনে যে কোনো শান্তিপূর্ণ ও অহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বৈধ। কিন্তু যখনই সেই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ বা অবৈধ অর্থ লেনদেনের সম্পর্ক পাওয়া যায়, তখনই তাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা বিপদ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে ১৯৮৫ সালের সেই ভয়াবহ ‘এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২’ বোমা হামলার স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছে সিএসআইএস। ওই হামলায় ৩২৯ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যা কানাডার ইতিহাসের বৃহত্তম সন্ত্রাসী হামলা। বর্তমানের চরমপন্থী মতাদর্শ সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে।
ভারত-কানাডা সম্পর্কের নতুন মোড়
এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময় প্রকাশিত হলো যখন ভারত ও কানাডার কূটনৈতিক সম্পর্ক এক অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল। তবে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী মার্ক সার্নির নেতৃত্বে দুই দেশই সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার পথে হাঁটছে। এই আবহে কানাডার নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থার এই স্বীকারোক্তি যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, খালিস্তানি নেটওয়ার্কের বিপজ্জনক গতিবিধি নিয়ে ভারত যে দীর্ঘকালীন উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল, তা এখন খোদ কানাডার গোয়েন্দাদের কাছেও প্রমাণিত সত্য।





