হায়দ্রাবাদের পাহাড়ে ‘মিনি ফ্রান্স’! নিজামের প্রিয় ফরাসি সেনাপতির রহস্যময় সমাধি আজও এক বিস্ময়

তিলোত্তমা হায়দ্রাবাদের পরতে পরতে মিশে আছে নিজামদের আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের কাহিনি। চারমিনার থেকে গোলকোন্ডা—ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে নিজামদের শৌর্য প্রতিফলিত হয়। কিন্তু ভাগ্যের এক অদ্ভুত খেলায়, হায়দ্রাবাদের মালাগপেটের একটি নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় আজও টিকে আছে এমন এক ঐতিহ্য, যার শিকড় প্রোথিত সুদূর ফ্রান্সে। এটি কোনো কাল্পনিক উপাখ্যান নয়, বরং এক ফরাসি বীর মিশেল জোয়াকিম মারি রেমন্ডের অমর কাহিনি, যাকে স্থানীয়রা ভালোবেসে আজও ‘মোজেস রেমন্ড’ বা ‘মুসা রেমন্ড’ বলে ডাকেন।

ঐতিহাসিক রহিম খানের মতে, ১৭৭৫ সালে ভাগ্যান্বেষণে ফ্রান্স থেকে ভারতে এসেছিলেন রেমন্ড। নিজের অসামান্য বীরত্ব এবং রণকৌশল দিয়ে তিনি খুব দ্রুত হায়দ্রাবাদের দ্বিতীয় নিজাম, নিজাম আলী খানের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। নিজাম রেমন্ডের ওপর এতটাই আস্থা রাখতেন যে, তাঁর গোটা সেনাবাহিনীকে ইউরোপীয় ধাঁচে ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন এই ফরাসি সেনাপতির হাতে। রেমন্ড তাঁর দক্ষতায় গঠন করেছিলেন ‘কোর দ্য ফ্রঁসে’ (Corps de Français) নামক ১৪,০০০ সৈন্যের এক বিশাল এবং অপরাজেয় রেজিমেন্ট। শুধু তাই নয়, নিজামের বাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করতে একটি অত্যাধুনিক বন্দুক তৈরির কারখানা ও কামান তৈরির গঞ্জ স্থাপনের কৃতিত্বও তাঁরই প্রাপ্য।

হায়দ্রাবাদের বুকে এক টুকরো ফ্রান্স:
হায়দ্রাবাদের মুসারামবাগ এলাকায় অবস্থিত ‘রেমন্ড সমাধি’ আজও সেই ফরাসি সামরিক স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। রেমন্ডের স্মৃতিতে নির্মিত ৭ মিটার উঁচু কালো গ্রানাইটের এই স্মৃতিস্তম্ভটি দেখলেই বোঝা যায় সে যুগে নিজামের দরবারে তাঁর প্রভাব কতটা গভীর ছিল। স্তম্ভের গায়ে খোদাই করা আছে রেমন্ডের নাম। তবে সবথেকে রহস্যময় হলো স্তম্ভটির পাশেই থাকা একটি গ্রিক-শৈলীর মণ্ডপ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রেমন্ডের মৃত্যুর পর তাঁর দেহাবশেষ সেখানে থাকলেও তাঁর হৃদয় সমাধিস্থ করা হয়েছিল এই বিশেষ মণ্ডপটিতেই। আজও স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বহু মানুষ এই সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। হায়দ্রাবাদের ইতিহাসের পাতায় এক ফরাসি সেনাপতির এই আধিপত্য আজও এক বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy