কর্মক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ? মেরুদণ্ড ও ঘাড়ের ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় জেনেনিন

মনে আছে সেই ছোটবেলার স্কুলের শারীরিক শিক্ষা ক্লাসের কথা? ম্যাডাম আমাদের সবসময় সোজা হয়ে বসতে উৎসাহিত করতেন এবং সোজা হয়ে বসার নানান উপকারিতার কথা বলতেন। তবে সেই সময় হয়তো আমরা ম্যাডামের কথায় তেমন একটা গুরুত্ব দিতাম না।

কিন্তু সময় বদলেছে। এখন আমাদের পড়ার পরিমাণ হয়তো কিছুটা কমেছে, তবে চেয়ারে বসে থাকার সময় অনেক বেড়েছে। আগে শুধু বেঞ্চ বা পড়ার টেবিলে বসতাম, কর্মজীবনে প্রবেশের পর বইয়ের জায়গা নিয়েছে কম্পিউটার। কাজের ধরণ বদলেছে ঠিকই, তবে বসার ভঙ্গিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আর এর ফলস্বরূপ, আমরা অনেকেই ঘাড় ব্যথা, পিঠ ব্যথাসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভুগছি।

এইসব সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে চেয়ারে বসার সময় কিছু নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। আসুন জেনে নেওয়া যাক সেই নিয়মগুলো:

চেয়ারে বসার সঠিক নিয়ম:

চেয়ারে সবসময় সোজা হয়ে বসুন। ঘাড় বা পিঠ বাঁকিয়ে বসা পরিহার করুন।
টেবিলটি চেয়ার থেকে এমন দূরত্বে রাখুন যাতে আপনার বাহুগুলো মেরুদণ্ডের সমান্তরাল থাকে।
আপনার কোমরের পেছনের অংশ এবং চেয়ারের ব্যাকরেস্টের মধ্যে কোনো ফাঁকা জায়গা রাখা উচিত নয়। প্রয়োজনে ছোট কুশন ব্যবহার করতে পারেন।
কম্পিউটার বা নোটবুকের সাথে কাজ করার সময় জিনিসগুলোকে এমন দূরত্বে রাখুন যা আপনার জন্য সুবিধাজনক হয়। চেয়ার এবং টেবিলের মধ্যে খুব বেশি দূরত্ব থাকা উচিত নয়।
লেখার সময় এবং কিবোর্ড বা মাউস ব্যবহারের সময় আপনার আঙুল থেকে কনুই পর্যন্ত পুরো হাত টেবিলের উপর আরামদায়কভাবে রাখুন।
দুই পা মেঝেতে সমানভাবে এবং আরামের সাথে রাখুন। শরীরের কোনো অংশ যেন নড়বড়ে বা ভারসাম্যহীন অবস্থায় না থাকে।
কম্পিউটার টেবিল ও চেয়ার ব্যবহারের বিজ্ঞানসম্মত নিয়ম:

মনিটরের উচ্চতা এমনভাবে সামঞ্জস্য করুন যাতে আপনার চোখ স্বাভাবিকভাবে সামনের দিকে থাকে, খুব বেশি উপরে বা নিচে তাকাতে না হয়। এটি চোখের উপর চাপ কমাবে এবং সামনের দিকে ঝুঁকে বসার প্রবণতাও হ্রাস করবে।
প্রাথমিক নিয়ম হলো, আপনার কনুইগুলো টেবিলের উপর সম্পূর্ণ সমতলভাবে থাকা উচিত। এটি হাতের পেশীর চাপ কমায় এবং কব্জির ব্যথা প্রতিরোধ করে।
পড়ার টেবিল ও চেয়ার ব্যবহারের নিয়ম:

দীর্ঘ সময় ধরে বসে পড়ার সময় সঠিক অঙ্গবিন্যাস বজায় রাখা জরুরি।
টেবিলে ঝুঁকে বসার সময় আপনার পিঠ যেন পেছনের দিকে কাত না হয়। এই ভঙ্গি মেরুদণ্ডের জন্য ক্ষতিকর এবং পিঠে ব্যথার কারণ হতে পারে।
পড়ার সময় টেবিলের ঢাল (inclination) প্রায় ৩০ ডিগ্রি হওয়া উচিত, যা মেরুদণ্ডকে সোজা রাখতে সাহায্য করে।
হাত-পায়ের সঠিক অবস্থান:

বসার সময় কাঁধ ও পিঠ শিথিল রাখুন, শক্ত করে বসবেন না।
টেবিলে আপনার কব্জি আরামদায়কভাবে রাখা উচিত। এর ফলে কার্পাল টানেল সিন্ড্রোমের ঝুঁকি কমে।
পা মেঝেতে ভাঁজ না করে সমতলভাবে রাখুন।
দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে চেয়ার ছেড়ে উঠে একটু হাঁটাহাঁটি করুন এবং শরীর টানটান করে নিন।
ভালোভাবে চেয়ারে বসার জন্য যা করণীয়:

চেয়ারে বসার সময় একটি আরামদায়ক ভঙ্গি খুঁজে বের করুন।
তবে যতই আরামদায়ক মনে হোক না কেন, দীর্ঘ সময় ধরে বসে কাজ করার সময় প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৫-১০ মিনিটের জন্য বিরতি নিন এবং হেঁটে আসুন। এতে শরীরে ঝিমুনি আসবে না এবং রক্ত সঞ্চালন সঠিকভাবে বজায় থাকবে।
আপনার কাজের ধরনের সাথে সঙ্গতি রেখে সঠিক উচ্চতা এবং আকারের চেয়ার ব্যবহার করুন। ভুল আকারের চেয়ারও সঠিক ভঙ্গিতে বসতে বাধা দিতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে বসে কাজ করা এখনকার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সামান্য সচেতনতা এবং বসার সঠিক নিয়ম মেনে চললে আমরা মেরুদণ্ড, ঘাড় ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি এবং একটি সুস্থ কর্মজীবন যাপন করতে পারি। তাই অবহেলা না করে আজ থেকেই সঠিক ভঙ্গিতে বসার অভ্যাস গড়ে তুলুন।