গোধরার সেই অভিশপ্ত এলাকাতেই ইতিহাস! মুসলিমদের ভোটে জিতলেন হিন্দু ঘরের মেয়ে ‘অপেক্ষা’

দীর্ঘ দুই দশক আগে যে গোধরা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণে শিরোনামে এসেছিল, আজ সেই মাটিই দিচ্ছে সম্প্রীতির এক অনন্য বার্তা। ২০০২ সালের সাবারমতি এক্সপ্রেসের অগ্নিকাণ্ডের সেই সংবেদনশীল এলাকা বলে পরিচিত ওয়ার্ড নম্বর ৭-এ ঘটে গেল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। মাত্র হাতেগোনা হিন্দু ভোটারের এই ওয়ার্ড থেকে নির্দল প্রার্থী হিসেবে রেকর্ড জয় ছিনিয়ে নিলেন হিন্দু ঘরের গৃহবধূ অপেক্ষা সোনি। এই জয় কেবল রাজনীতির নয়, বরং জাত-পাত ও ধর্মের উর্ধ্বে গিয়ে মানবিকতার জয় হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল।

হারের গ্লানি মুছে জেদই হল হাতিয়ার
অপেক্ষা সোনির এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। ২০২১ সালের নির্বাচনে মাত্র ১০০ ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি। সেই হারের পর রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা তা হতে দেননি। ওয়ার্ডের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম সম্প্রদায়ের হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা অপেক্ষাকে আবার লড়াই করার জন্য জেদ ধরেন। তাঁরাই দিয়েছিলেন জয়ের গ্যারান্টি। সেই ভরসা থেকেই আবার লড়াইয়ের ময়দানে নামেন তিনি।

পরিচয় যখন ‘ঘরের মেয়ে’
অপেক্ষা এই ওয়ার্ডেরই বাসিন্দা, যেখানে তাঁর স্বামী নৈনেশ সোনির একটি গয়নার দোকান রয়েছে। নির্বাচনে হারলেও এলাকার মানুষের সঙ্গ ছাড়েননি তিনি। নর্দমা পরিষ্কার, পানীয় জলের সমস্যা বা ছোটখাটো নাগরিক পরিষেবা—সবক্ষেত্রেই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করাতেন। অনেক সময় নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করেও এলাকার সমস্যার সমাধান করেছেন। এই নিরন্তর সেবা তাঁকে কেবল একজন প্রার্থী নয়, বরং ওই এলাকার মানুষের কাছে ‘দিদি’ বা ‘মেয়ে’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ধর্মের বেড়াজাল টপকে একতার জয়
ওয়ার্ড ৭-এ সাতপুল, হিলানি পাড়া, গেণী প্লট ও সিগন্যাল ফালিয়ার মতো এলাকা রয়েছে, যা রেলস্টেশনের খুবই কাছে। স্থানীয় কাউন্সিলর সাজিদ কালা জানান, “এই ওয়ার্ডে হিন্দু ভোটারের সংখ্যা মেরেকেটে দুই ডজন। অথচ সেই ওয়ার্ড থেকেই অপেক্ষা বিপুল ভোটে জয়ী হলেন। এটি প্রমাণ করে মানুষ বিভাজনের রাজনীতির বদলে কাজের মানুষকে বেছে নিতে পছন্দ করেন।” জেলা কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রফিক তিজোরিওয়ালাও এই জয়কে গণতন্ত্রের আসল রূপ বলে অভিহিত করেছেন।

গুজরাটের পুর নির্বাচনে যখন মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেলের নেতৃত্বে বিজেপি ঝোড়ো জয় ছিনিয়ে নিয়েছে, তখন গোধরার এই ছোট ওয়ার্ডের ফল যেন বৃহত্তর ভারতবর্ষের সামনে এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। অপেক্ষা সোনির এই জয় প্রমাণ করে দিল, সততা আর সেবার মানসিকতা থাকলে ধর্মের পাঁচিল ভেঙে ভালোবাসা আর বিশ্বাসের জোয়ার আনা সম্ভব।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy