উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা বিধানসভা—যা রাজনৈতিক মহলে ‘মতুয়াগড়’ নামেই সমধিক পরিচিত। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া ইছামতী ও যমুনা নদীর তীরবর্তী এই জনপদের ভাগ্য নির্ধারিত হয় মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রটি এখন তৃণমূল ও বিজেপির কাছে প্রেস্টিজ ফাইট। একদিকে মতুয়া ঠাকুরবাড়ির সন্তান তথা বিদায়ী বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর, অন্যদিকে তৃণমূলের নরোত্তম বিশ্বাস। তবে এবারের লড়াইয়ে মূল ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘এসআইআর’ (SIR) বা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ১৯ হাজার নাম।
মতুয়া মনস্তত্ত্ব ও রাজনীতির সমীকরণ:
২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে এখানে বিজেপি ৩৫ হাজার ভোটে এগিয়ে থাকলেও, ২০২১-এ জয়ের ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৭৮। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে সেই লিড আরও কমে ২৭ হাজারে ঠেকেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, গত পাঁচ বছর বিধায়ক সুব্রত ঠাকুরকে এলাকায় দেখা যায়নি। বিশেষ করে এসআইআর-এ নাম বাদ পড়া নিয়ে হিন্দু মতুয়াদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনুপ্রবেশকারী তাড়ানোর নামে খোদ হিন্দুদের নাম বাদ যাওয়ায় ব্যাকফুটে গেরুয়া শিবির। নরোত্তম বিশ্বাস এই ইস্যুকেই হাতিয়ার করে মানুষের দুয়ারে পৌঁছাচ্ছেন।
উন্নয়ন না কি শুধুই বঞ্চনা?
গাইঘাটা ও গোবরডাঙার মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু ‘গোবরডাঙা হাসপাতাল’। আধুনিক পরিকাঠামো থাকলেও হাসপাতালটি আজ আগাছায় ভরা এক ভুতুড়ে অট্টালিকা। চিকিৎসা পেতে স্থানীয়দের ছুটতে হয় বনগাঁ বা ঠাকুরনগর। সঙ্গে রয়েছে ইছামতী ও যমুনা নদী সংস্কারের দাবি। নদী মজে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন মৎস্যজীবীরা। রাস্তার বেহাল দশা এবং পানীয় জলের প্রকল্পের নামে রাস্তা খুঁড়ে রাখার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
ত্ৰিমুখী লড়াইয়ের হাওয়া:
বিজেপি প্রার্থী সুব্রত ঠাকুরের দাবি, মোদীজির নেতৃত্বে এলাকার বিকাশ হবে এবং ভোটার তালিকায় নাম ফেরানোর তদ্বির করবেন তিনি। পাল্টা তৃণমূলের নরোত্তম বিশ্বাসের হুঙ্কার, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন ঘরে ঘরে পৌঁছেছে, বিধায়ক কাজ করেননি বলেই মানুষ এবার আমাদের ফেরাবে।” এরই মাঝে বামফ্রন্ট সমর্থিত সিপিআই প্রার্থী সজল বিশ্বাস দুই শিবিরের ‘সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’র বিরুদ্ধে বিকল্প হওয়ার লড়াই লড়ছেন।
গাইঘাটার সাধারণ মানুষ এখন আতঙ্কে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। রামপুরের সুকুমার দাসের মতো ভোটারদের সপাট জবাব, “ফল কী হবে জানি না, বললে মার খেতে হবে।” শেষ পর্যন্ত ১৯ হাজার বাদ পড়া ভোটার এবং গোবরডাঙা হাসপাতালের বন্ধ গেট কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে, তা জানা যাবে ৪ মে।





