ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে ফেলে বড় চমক! আয়ারল্যান্ডকে সিরিজে হারিয়ে সরাসরি বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করল আফগানিস্তান

আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে দুর্দান্ত জয় ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ঐতিহাসিক বিশ্বরেকর্ড গড়ে ফেলল আফগানিস্তান ক্রিকেট দল। সোমবার বেলফাস্টে অনুষ্ঠিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে আইরিশদের ৩ উইকেটে হারিয়ে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ২-০ ব্যবধানে অপরাজিত লিড নিশ্চিত করেছে সফরকারীরা। এই জয়ের ফলে শুধু সিরিজ জয়ই নয়, আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ আটে নিজেদের অবস্থান পাকা করে সরাসরি ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলা নিশ্চিত করে ফেলল আফগানরা। এর সুবাদে ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম ধারাবাহিক শক্তি হিসেবে নিজেদের আরও একবার প্রমাণ করল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির এই অদম্য ক্রিকেট দল। এর মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মেগা ইভেন্টে সরাসরি খেলার বিরল যোগ্যতা অর্জন করল আফগানিস্তান।
উল্লেখ্য, সিরিজের প্রথম ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পণ্ড হয়ে গেলেও, দ্বিতীয় ম্যাচে দুর্দান্ত কামব্যাক করে ৯২ রানের বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিল রহমত শাহ অ্যান্ড কোম্পানি। ফলে সোমবারের তৃতীয় ম্যাচটি উভয় দলের জন্যই অত্যন্ত প্রেস্টিজিয়াস ও টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বেলফাস্টের মাঠে এদিনের ম্যাচটির ভাগ্য বেশ কয়েকবার পেন্ডুলামের মতো এদিক-ওদিক দুললেও, শেষ পর্যন্ত স্নায়ুর চাপ ধরে রেখে দুর্দান্ত জয় তুলে নেয় আফগানিস্তান। এদিন টসে হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে আফগান বোলারদের বিধ্বংসী ও নিয়ন্ত্রিত বোলিং আক্রমণের সামনে টিকতে পারেনি আইরিশ ব্যাটাররা। নির্ধারিত ওভারের আগেই মাত্র ৪৬.৩ ওভারে মাত্র ২০6 রানেই গুটিয়ে যায় আয়ারল্যান্ডের পুরো ইনিংস। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৩৬ রান করেন গাভিন হোয়ে। আফগান বোলিং লাইনআপের মূল চালিকাশক্তি তথা তারকা লেগ স্পিনার ও অলরাউন্ডার রশিদ খান মাত্র ৩টি উইকেট শিকার করে ম্যাচের রঙ পাল্টে দেন। রশিদ ছাড়াও আল্লাহ গজনফর অসাধারণ বোলিং করে ৩টি উইকেট তুলে নেন এবং ইয়ামিন আহমদজাই ঝুলিতে ভরেন জোড়া উইকেট।
জবাবে ২০৭ রানের মাঝারি লক্ষ্যমাত্রা তাড়া করতে নেমে শুরুটা আগ্রাসী মেজাজেই করেছিল আফগানিস্তান। দলের মারকুটে ওপেনার রহমানুল্লাহ গুরবাজের অসাধারণ ব্যাটিং প্রদর্শনী দেখে একসময় মনে হচ্ছিল সহজেই ম্যাচ জিতে নেবে তারা। স্কোরবোর্ডে মাত্র ২ উইকেটে ৯৭ রান তুলে জয়ের সুবাস পেতে শুরু করেছিল সফরকারীরা। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা গুরবাজ ব্যক্তিগত ৭১ রানের একটি অনবদ্য ইনিংস খেলে আউট হন। কিন্তু এরপরই আচমকা ব্যাটিং ধস নামে আফগান শিবিরে। মাত্র ৭৯ রানের মধ্যে পরপর ৫টি উইকেট হারিয়ে চরম বিপদের মুখে পড়ে যায় দল। ১৭৮ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে যখন হারের কালো ছায়া গ্রাস করছিল, ঠিক তখনই দলের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন অধিনায়ক তথা অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার রশিদ খান। শেষ মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ব্যাট হাতে অসামান্য দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন তিনি। মাত্র ৪৩ বলে ৪টি নান্দনিক চারের সাহায্যে অপরাজিত ৩৭ রানের এক ম্যারাথন ক্যামিও ইনিংস খেলে দলের জয় নিশ্চিত করে তবেই মাঠ ছাড়েন তিনি। তাঁর সঙ্গে যোগ্য সংগত করে ২৬ বলে ৪ রান করে অপরাজিত থেকে যান ইয়ামিন আহমদজাই। শেষ পর্যন্ত ৪৪.৫ ওভারে ৭ উইকেটে ২০৭ রান সংগ্রহ করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায় আফগানিস্তান।
এই অবিস্মরণীয় জয়ের সুবাদে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে নিজেদের আট নম্বর স্থানটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করে ফেলল রশিদ খানের দল। আইসিসি-র নিয়ম অনুযায়ী, দুই আয়োজক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবোয়ের পাশাপাশি কাট-অফ ডেট পর্যন্ত র্যাঙ্কিংয়ের প্রথম আটে থাকা দলগুলি সরাসরি ২০২৭ বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। সেই নিয়মের নিরিখেই অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবোয়ের পর দশম দল হিসেবে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পকেটে পুরল আফগানরা। অন্যদিকে, এই ফলাফলের ফলে আরও একবার চরম হতাশাজনক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হলো ক্রিকেট বিশ্বের দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। এই মুহূর্তে র্যাঙ্কিংয়ের দশম স্থানে ছিটকে যাওয়া ক্যারিবিয়ানদের আরও একবার কঠিন বাছাইপর্ব বা কোয়ালিফায়ার টুর্নামেন্টের বৈতরণী পার করে তবেই বিশ্বকাপে পৌঁছতে হবে। চার বছর আগেও অনুরূপ কঠিন পরিস্থিতিতে কোয়ালিফায়ার খেলে মূলপর্বের টিকিট অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল ক্লাইভ লয়েড ও ভিভ রিচার্ডসের উত্তরসূরিরা। সবমিলিয়ে, ক্রিকেটের আঙিনায় আফগানিস্তানের এই রূপকথার উত্থান আজ সমগ্র বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।