ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝেই মার্কিন সেনেটের বড় ধাক্কা! পুতিনের তেল কিনে কি এবার চরম বিপদে পড়তে চলেছেন মোদী?

পশ্চিমী দেশগুলির তরফ থেকে লাগাতার নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর কড়াকড়ি জারি থাকা সত্ত্বেও সস্তা রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের অটল ও অবিচল অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার ঝড় তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি ও তেল বাণিজ্যের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের লক্ষ্যে কঠোর আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও, জুলাই মাসে ভারতের রুশ তেল আমদানির পরিমাণ টানা দ্বিতীয় মাসের মতো এক অভাবনীয় ও সর্বকালীন রেকর্ড স্তরে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, মার্কিন চাপকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে ভারত সরকার দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তাকেই সর্বদা সর্বাগ্রে স্থান দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ও কেপলারের তথ্যানুযায়ী, মার্কিন সেনেটে বিপুল ভোটে—বিশেষ করে ৮৬-১১ ব্যবধানে ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট অফ 2026’ বিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে। এই নতুন ও কঠোর বিলের মূল লক্ষ্য হলো রাশিয়ার তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি থেকে অর্জিত বিপুল আয়ের ওপর প্রচণ্ড আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা, যার মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য মস্কোর যুদ্ধ তহবিল ও আর্থিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব হবে। বিলটির বর্তমান খসড়া বিধান অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার প্রধান জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলির কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপ করার চরম আইনি ক্ষমতা লাভ করবেন। স্বাভাবিকভাবেই এই সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার তালিকায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ দুই উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি তথা ভারত এবং চিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে।
অবশ্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এর অর্থ এই নয় যে ভারতের ওপর পাকাপাকিভাবে ইতিমধ্যেই ১০০ শতাংশ শুল্ক বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত বর্তমান এই আইনগত প্রক্রিয়াটি মার্কিন প্রশাসনের হাতে একটি সম্ভাব্য ও শক্তিশালী চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেই রাখা হয়েছে। আগামী দিনে এই বিলটিকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদেও পাস করাতে হবে এবং তারপরেই হোয়াইট হাউজ বা মার্কিন প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে যে তারা এই শুল্কের খাঁড়া কীভাবে এবং কার কার ওপর প্রয়োগ করবে। মার্কিন আইনের এই তলোয়ার মাথার ওপর ঝুললেও ভারত তার নিজস্ব শক্তির নীতি থেকে একচুলও সরে আসেনি। ‘সেন্টার ফর রিসার্চ on এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার’ (CREA)-এর সাম্প্রতিক ডেটা অনুযায়ী, জুলাই মাসে ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি তেল শোধনাগারগুলি রেকর্ড ৫.৫ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা বিগত জুনের তুলনায় প্রায় ২.১ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশই ছিল সরাসরি অপরিশোধিত বা ক্রুড অয়েল।
পরিমাণগত ও অর্থমূল্যের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, গত জুন মাসে ভারত মোট ৪৫০ কোটি ইউরো মূল্যের রুশ অপরিশোধিত তেল ক্রয় করেছিল, যা রাশিয়ার কাছ থেকে আমদানিকৃত সর্বমোট ৫৫০ কোটি ইউরো মূল্যের জীবাশ্ম জ্বালানির প্রায় ৮৩ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ভারতের সার্বিক তেল আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমলেও, মস্কোর কাছ থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে এই হ্রাসের কোনো বালাই দেখা যায়নি। ২০২৬ সালের জুন মাসে ভারত একাই প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন (MMT) রুশ তেল আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। এই সুচিন্তিত ও সুকৌশলী আমদানির ফলে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ পরিমাণগত দিক থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য ৪৮ শতাংশে এবং অর্থমূল্যের দিক থেকে তা ছুঁয়েছে প্রায় ৪৮.৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকালীন অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই ভারতের এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।