আমেরিকা-ইজরায়েলের রক্তচাপ বাড়াল তেহরান! খামেনেইর নির্দেশে হঠাৎ কেন এত বড় পরিবর্তন ঘটল ইরানের ডিফেন্স কোরে?

আমেরিকা এবং ইজরায়েলের সঙ্গে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও চরম উত্তেজনার আবহে ইরানের সামরিক ও প্রতিরক্ষা কাঠামোয় এক সুদূরপ্রসারী ও বড় ধরনের রদবদলের নির্দেশ দিলেন সেদেশের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই। ইরানের অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই নির্দেশাবলীর আওতায় আনা হয়েছে দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী তিন সামরিক স্তম্ভ—ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী এবং বাসিজ মিলিশিয়া বাহিনীকে। এই তিন প্রধান বাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে মোট ছয়জন নতুন অভিজ্ঞ ও কট্টরপন্থী কমান্ডারকে নিয়োগ করা হয়েছে। বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের বর্তমান স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে সামরিক কমান্ড কাঠামোকে আরও সুসংহত, ঐক্যবদ্ধ ও আক্রমণাত্মক করে তোলার লক্ষ্যেই এই উচ্চপর্যায়ের পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগগুলোর মধ্যে অন্যতম হল মেজর জেনারেল আহমাদ ভাহিদিকে আইআরজিসি-র নতুন কমান্ডার-ইন-চিফ বা সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা। আইআরজিসি হলো ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ও কৌশলগত সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থা। ভাহিদি রেভল্যুশনারি গার্ডের একজন অত্যন্ত প্রবীণ ও পরীক্ষিত কর্মকর্তা। এর আগে তিনি আইআরজিসি-র অত্যন্ত গোপনীয় ও প্রভাবশালী বিদেশী কার্যক্রম পরিচালনাকারী শাখা ‘কুদস ফোর্স’-এর সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইরানের যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা এবং অতি সংবেদনশীল কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথা মাথায় রেখেই তাঁকে এই শীর্ষ পদে উন্নীত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, মেজর জেনারেল আলি আবদোল্লাহিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর নতুন চিফ অফ স্টাফ বা প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আবদোল্লাহি এর আগে ‘খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স’-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড কাঠামোটি মূলত আইআরজিসি ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর মধ্যকার কার্যক্রম ও কৌশলগত অপারেশনগুলির মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় সাধনের মূল দায়িত্ব পালন করে থাকে।

কার্যক্রম পরিচালনার স্তরেও এই রদবদলের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। রিয়ার অ্যাডমিরাল আলি আজমায়িকে আইআরজিসি নৌবাহিনীর নতুন কমান্ডার পদে বসানো হয়েছে। অন্যদিকে, রেভল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্কযুক্ত প্রভাবশালী গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যক্তিত্ব হোসেইন তায়েবকে বাসিজ সংগঠনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া কিউমার্স হেইদারি ও মোস্তফা ইজাদিকে যৌথ সামরিক বাহিনী ও আইআরজিসি-র কমান্ড কাঠামোর মধ্যে শীর্ষ উপ-প্রধানের পদে বসানো হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রদবদল নিছক কোনো রুটিন কর্মী পরিবর্তন বা প্রশাসনিক রদবদল নয়। এটি মূলত নতুন সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পূর্ণ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সুসংহত করার এবং চরম সংকটময় মুহূর্তে অভিজ্ঞ ও কট্টরপন্থী কমান্ডারদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর একটি সুচিন্তিত কৌশল। মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করলে এই নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ইরানের কৌশলগত নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে আইআরজিসি ইতিমধ্যেই একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও একক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল যে, ভাহিদি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা ইরানের সামরিক কৌশল নির্ধারণ এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার সময় কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। আবদোল্লাহির এই পদোন্নতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ কমান্ডটি ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং আইআরজিসির সংযোগস্থলে অবস্থান করে। ফলে যুদ্ধকালীন জরুরি পরিস্থিতিতে উভয় বাহিনীর মধ্যে সর্বোচ্চ সমন্বয় সাধনের প্রক্রিয়াকে এটি আরও শক্তিশালী করবে। মোজতবা খামেনেইর এই অভূতপূর্ব পদক্ষেপে তেহরান কমান্ডের নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত আরও মজবুত করতে সক্ষম হবে।