“৪ তলার অনুমতিতে ৭ তলা!”-বেআইনি প্রোমোটিং সাম্রাজ্যের নেপথ্যে কী?

রাজ্যজুড়ে এখন বুলডোজারের গর্জন। একের পর এক বেআইনি বহুতল গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বছরের পর বছর ধরে কীভাবে প্রশাসনিক চোখ এড়িয়ে শহরে গজিয়ে উঠল এই অবৈধ প্রোমোটিং সাম্রাজ্য? কলকাতার উপকণ্ঠের এক দুঁদে প্রোমোটার ফাঁস করলেন এই অবৈধ নির্মাণের পেছনের নেপথ্য গল্প।

কেন অবৈধ পথে প্রোমোটাররা? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই প্রোমোটারের দাবি, ক্রমবর্ধমান জমির দাম আর নির্মাণ সামগ্রীর খরচ এখন আকাশচুম্বী। তাঁর হিসেব অনুযায়ী:

  • কলকাতার উপকণ্ঠে ২ কাঠা জমির দাম প্রায় ১ কোটি টাকা।

  • বহুতল নির্মাণে খরচ হয় ৭০-৮০ লক্ষ টাকা।

  • এর সঙ্গে যোগ হয় মালিকের দাবি এবং ফ্ল্যাট দেওয়ার খরচ। এই সব খরচ মিটিয়ে বৈধ উপায়ে খুব বেশি লাভ থাকে না। এখানেই লুকিয়ে আসল জটিলতা।

কাটমানি ও রাজনৈতিক মদত: প্রোমোটারের অভিযোগ, নির্মাণের প্রতিটি ধাপে স্থানীয় নেতা থেকে প্রভাবশালী—অনেকেরই দাবি থাকে। ‘উপরে’ টাকা পৌঁছে দিলে নিয়ম ভেঙে নকশার বাইরে বাড়তি তলা তোলা বা খোলা জায়গা (Open Space) দখল করা খুব কঠিন কাজ নয়। তাঁর স্পষ্ট স্বীকারোক্তি, “টাকা ঠিক জায়গায় পৌঁছালে রাজনৈতিক মদত মেলে, আর তার ফলেই বছরের পর বছর আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ায় বেআইনি বহুতল।”

অতিরিক্ত লাভের নেশা: বেশি স্কোয়ার ফিট বানিয়ে ফ্ল্যাট বিক্রির সংখ্যা বাড়ানোর জন্য অনেকেই কার্পেট এরিয়া বাড়িয়ে দেন। ৪ তলার অনুমতি থাকলে সেখানে ৬ বা ৭ তলা তৈরি করা হয় শুধুমাত্র অতিরিক্ত মুনাফার লোভে। এই বাড়তি ফ্লোর থেকেই আসে ‘অতিরিক্ত’ লাভ, যা কাটমানি দেওয়ার পরেও প্রোমোটারের পকেটে মোটা টাকা ঢোকায়।

বুলডোজার কি একমাত্র সমাধান? বর্তমানে রাজ্যজুড়ে চলা ভাঙার অভিযানের ফলে প্রোমোটার মহলে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শুধু বুলডোজার দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাঁদের মতে: ১. রাজনৈতিক যোগসাজশ: যারা বেআইনি নির্মাণে মদত দিয়েছে, সেই আর্থিক ও রাজনৈতিক আঁতাত খুঁজে বের করা জরুরি। ২. প্রশাসনিক স্বচ্ছতা: পুরসভা ও প্রশাসনের সঠিক নজরদারি ছাড়া এই সাম্রাজ্য ভাঙা কঠিন। ৩. ভবিষ্যৎ সুরক্ষা: সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ নিয়ম মেনে কাজ করলে তবেই নির্মাণ শিল্পে সুদিন ফিরবে।

বর্তমানে বেআইনি নির্মাণ ভাঙার এই জোরালো অভিযান কি তবে সেই দীর্ঘদিনের ‘অশুভ আঁতাত’-এর জাল ছিঁড়তে পারবে? নাকি বদলাবে কেবল মুখ, কিন্তু কারবার চলবে অন্য পথে? প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy