সরকার বদলের পর এবার লোগো বদল, উধাও মমতার ‘বিশ্ব বাংলা’!

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রশাসনিক স্তরে পরিবর্তনের গতি আরও তীব্র করল বিজেপি পরিচালিত নতুন সরকার। এবার খোদ রাজ্য সরকারের লোগো এবং থিমে বড়সড় বদল আনার প্রক্রিয়া শুরু হলো। তৃণমূল জমানার অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক পরিচয় তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগো এবার ধীরে ধীরে সরকারি দফতর, ওয়েবসাইট এবং বিভিন্ন পরিকাঠামো থেকে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। তার জায়গায় সরকারি প্রতীক হিসেবে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে ভারতের জাতীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ।

ইতিমধ্যেই এই পরিবর্তনের বড় প্রভাব দেখা গেছে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন বা সল্টলেক স্টেডিয়ামে। সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বিশালাকার ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগোটি। শুধু পরিকাঠামোই নয়, রাজ্য সরকারের একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সরকারি ওয়েবসাইট থেকেও এই লোগো সরানোর কাজ শুরু করেছে প্রশাসন।

সবচেয়ে বড় রদবদল নজর কেড়েছে রাজ্য সরকারের মূল তথ্যপ্রযুক্তি পোর্টাল ‘এগিয়ে বাংলা’ ওয়েবসাইটে। সেখান থেকে ‘বিশ্ব বাংলা’র বাংলা ‘ব’ অক্ষর চিহ্নিত লোগোটি পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়েছে। তার বদলে এখন জ্বলজ্বল করছে জাতীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ। শুধু লোগো বদলই নয়, ওয়েবসাইটের চেনা নকশা এবং রঙেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। তৃণমূল সরকারের আমলের পরিচিত ‘নীল-সাদা’ থিম বদলে এখন ওয়েবসাইটে ‘গেরুয়া’ রঙের ছোঁয়া স্পষ্ট। একই সঙ্গে পোর্টালটি আপডেট করে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি ও বার্তা যুক্ত করা হয়েছে।

‘বিশ্ব বাংলা’ কী এবং কীভাবে এর সূচনা?
২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে ‘বিশ্ব বাংলা’ ব্র্যান্ডের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। বাংলার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, পর্যটন, ঐতিহ্য এবং কুটির ও হস্তশিল্পকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। গ্লোব বা পৃথিবীর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাংলা অক্ষর ‘ব’ দিয়ে তৈরি এই লোগোটি নিজেই এঁকেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমে এটি সরকারি বিপণন ও পণ্যে ব্যবহৃত হলেও, পরবর্তীতে প্রায় ১৩ বছর ধরে এটিই হয়ে ওঠে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অলিখিত প্রশাসনিক প্রতীক। সরকারি নথি, ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে রাস্তার আলো ও সৌন্দর্যায়নের কাজেও এই লোগো ব্যবহার করা হতো।

কেন সরানো হচ্ছে এই লোগো?
বর্তমান শাসকদল বিজেপির নেতৃত্বের দাবি, কোনও রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির ব্যক্তিগতভাবে তৈরি করা নকশা বা লোগো একটি রাজ্যের সরকারি পরিচয় কিংবা সাংবিধানিক প্রতীক হতে পারে না। তাঁদের মতে, সমস্ত সরকারি কাজে ভারতের জাতীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ ব্যবহার করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত এবং সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য। সেই কারণেই প্রশাসনিক স্তরে এই প্রতীকী পালাবদল ঘটানো হচ্ছে।

লোগোর মালিকানা ও রয়্যালটি বিতর্ক: আসল সত্য কী?
লোগো বদলের এই আবহে সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে একটি বিতর্ক ও গুজব মাথাচাড়া দিয়েছে। অনেকের দাবি, এই লোগো ব্যবহারের জন্য নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের কাছ থেকে কোনও রয়্যালটি বা লভ্যাংশ পান। তবে এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ভুল।

এর আগে ২০১৭ সালেও এই লোগোর মালিকানা নিয়ে সরগরম হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। তৎকালীন বিজেপি নেতা মুকুল রায় অভিযোগ তুলেছিলেন যে, এই লোগোটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। সেই সময় তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আইনিভাবে সেই অভিযোগ খারিজ করেন। পরবর্তীতে স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, লোগোটি তিনি নিজেই এঁকেছেন এবং কোনও রকম আর্থিক সুবিধা বা রয়্যালটি ছাড়াই তা পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে চিরদিনের জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছেন। ফলে এই লোগো থেকে কারও ব্যক্তিগতভাবে টাকা পাওয়ার কোনও বিষয় নেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগোটি তৃণমূল সরকারের ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল। রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সেই প্রতীকের বিদায় এবং অশোকস্তম্ভের প্রত্যাবর্তন আসলে কেবল প্রশাসনিক রদবদল নয়, বরং বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্র্যান্ডিংয়ের এক বড়সড় প্রতীকী পালাবদল।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy